৩৬ দিন · অসংখ্য মানুষের কণ্ঠ · একটি ভয়হীন বাংলাদেশের স্বপ্ন

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪
এই ইতিহাস আমাদের সবার

শুরু হয়েছিল বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবিতে। গুলি চলল, ইন্টারনেট নিভল, ঘরে ঘরে ভয় ঢুকল। কিন্তু মানুষ আর পিছু হটেনি। শিক্ষার্থী, শ্রমিক, নারী, অভিভাবক, শিক্ষক, শিল্পী, পেশাজীবী ও প্রবাসী—সব কণ্ঠ মিলে জুলাইকে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত করেছিল। এটি সেই মানুষের ইতিহাস; এটি আমাদের সবার ইতিহাস।

05.06দাবি
16.07রক্ত
03.08এক দফা
05.08৩৬ জুলাই
মানুষের জুলাইয়ে প্রবেশ করুন

জুলাই ছিল একসঙ্গে জেগে ওঠা বাংলাদেশের নাম—ছাত্রের দাবি, মায়ের শোক, শ্রমিকের সাহস আর জনতার কণ্ঠে লেখা আমাদের সবার ইতিহাস।

জুলাই সবার

শিক্ষার্থীরা শুরু করেছিল।
তারপর উঠে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ।

কেউ এসেছিল ক্যাম্পাস থেকে, কেউ কারখানা বা হাসপাতাল থেকে, কেউ সন্তানকে খুঁজতে, কেউ অপরিচিত আহত মানুষকে বাঁচাতে। নারী, শ্রমিক, শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, শিল্পী, রিকশাচালক, দোকানদার ও প্রবাসী—ভিন্ন জীবনের মানুষকে এক করেছিল একটি বিশ্বাস: রাষ্ট্র নাগরিককে ভয় দেখাবে না; রাষ্ট্র নাগরিকের কাছে জবাবদিহি করবে।

এই জুলাইকে কোনো দল, নেতা বা সংগঠন একার সম্পত্তি বলতে পারে না। এর মর্যাদা রক্ষা মানে পুরো সত্য বলা—রাষ্ট্রীয় দমন ও দলীয় সহিংসতার বিচার চাওয়া, আবার আন্দোলনের মধ্যে ও ৫ আগস্টের পর সংঘটিত প্রতিশোধমূলক হামলা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতারও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা। মানুষের জুলাই মানে সবার ন্যায়বিচার।

দাবি থেকে গণঅভ্যুত্থান

একটি দাবি। একটি গুলি। তারপর—একটি দেশ উঠে দাঁড়াল।

প্রথমে প্রশ্ন ছিল চাকরিতে ন্যায্যতার। গুলি, হামলা, কারফিউ ও ইন্টারনেট বন্ধ সেই প্রশ্নকে বদলে দেয়। মানুষ তখন শুধু কোটা নয়—জীবন, মর্যাদা এবং রাষ্ট্র কার জন্য—তার উত্তর চাইতে রাস্তায় নামে।

ক্ষতের হিসাব

সংখ্যা নয়—নাম, মুখ, পরিবার এবং থেমে যাওয়া ভবিষ্যৎ

OHCHR-এর হিসাব ১ জুলাই–১৫ আগস্ট ২০২৪ সময়কালের অনুমান; এটি চূড়ান্ত নামভিত্তিক তালিকা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে একজন মানুষ আছেন।

৩৬ দিনের দিনপঞ্জি

৩৬ দিনে একটি দেশের ভয় ভাঙার দিনপঞ্জি

এখানে শুধু তারিখ নেই। আছে একটি স্লোগানের ছড়িয়ে পড়া, একটি গুলির সামনে দাঁড়ানো বুক, অন্ধকারে বন্ধ হয়ে যাওয়া ইন্টারনেট, শোকের মিছিল এবং শেষ পর্যন্ত কারফিউ ভেঙে এগিয়ে যাওয়া মানুষ। প্রতিটি বাঁকের পাশে উৎস আছে—কারণ মানুষের স্মৃতিকে সত্যের শক্তি নিয়েই বাঁচতে হবে।

    ক্যালেন্ডার থেমেছিল, মানুষ থামেনি

    কেন ৫ আগস্টকে বলা হয় “৩৬ জুলাই”

    ৩১ জুলাইয়ের রাত পেরিয়ে ক্যালেন্ডার আগস্টে ঢুকেছিল। কিন্তু যেসব মা সন্তান হারিয়েছেন, যেসব তরুণ বন্ধুর রক্তমাখা স্মৃতি নিয়ে আবার রাস্তায় ফিরেছেন, তাঁদের কাছে জুলাই শেষ হওয়ার মতো কোনো মাস ছিল না। বিচার না পাওয়া পর্যন্ত, দমন না থামা পর্যন্ত এবং মানুষের কণ্ঠ বিজয়ে পৌঁছানো পর্যন্ত তাঁরা দিন গুনেছেন জুলাইয়ের ধারাবাহিকতায়—১ আগস্ট তাই ৩২ জুলাই, আর ৫ আগস্ট ৩৬ জুলাই। এটি ক্যালেন্ডারের অতিরিক্ত পাঁচ দিন নয়; রাষ্ট্রের লেখা সমাপ্তি অস্বীকার করে মানুষের নিজের ইতিহাস নিজে শেষ করার নাম।

    ৩৬ জুলাই সেই দিনের নাম—যেদিন শোক পিছু হটেনি, ভয় পথ আটকাতে পারেনি, আর মানুষ ঘোষণা করেছিল: এই রাষ্ট্রে নাগরিকের জীবন, কণ্ঠ ও মর্যাদাই সবার আগে।

    সরকারি ক্রোনোলজিতে ৩৬ জুলাই দেখুন ↗

    মানুষের সাক্ষ্য · OHCHR তদন্ত ২০২৫

    মানুষ যা দেখেছিল—তদন্তেও উঠে এসেছে সেই দমনের চিত্র

    জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর বলেছে, সাবেক সরকার ও তার নিরাপত্তা–গোয়েন্দা কাঠামো, এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সহিংস উপাদানগুলো বিক্ষোভ দমনে পদ্ধতিগতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত ছিল—এমন বিশ্বাসের যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের জ্ঞান, সমন্বয় ও নির্দেশনায় বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং নির্যাতন সংঘটিত হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

    — OHCHR Fact-Finding Report, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ (সারসংক্ষেপিত অনুবাদ)

    পূর্ণ প্রতিবেদন খুলুন ↗

    ক্যামেরায় মানুষের জুলাই

    চারটি ছবি। চারটি মুহূর্ত। একটি জেগে ওঠা বাংলাদেশ।

    একটিতে প্রতিরোধ দেয়ালে আঁকা, একটিতে পতাকার সামনে শপথ, একটিতে এক দফার পেছনে মানুষের ঢল, আর একটিতে ৩৬ জুলাইয়ের বিস্ফোরিত মুক্তি। ছবিগুলো শুধু দৃশ্য নয়—মানুষের ভেতরে ভয় ভাঙার মুহূর্ত।

    কারা ছিল জুলাই?

    যখন সবাই রাস্তায়—তখনই জুলাই গণঅভ্যুত্থান

    জুলাই থেকে নতুন রাজনৈতিক যাত্রা

    জুলাইয়ের সাহসকে রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকারে নেওয়া

    ইতিহাসের ধারাবাহিকতা: National Citizen Party (NCP) প্রতিষ্ঠিত হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫—জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রায় সাত মাস পর। তাই জুলাইয়ে এই তরুণদের পরিচয় ছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক ও সংগঠক; পরে সেই অভিজ্ঞতা, জনআকাঙ্ক্ষা ও সংস্কারের দাবি একটি নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগে রূপ নেয়।

    জুলাইয়ে নেতৃত্ব দিয়ে পরিচিত নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী, হাসনাত আবদুল্লাহ ও সারজিস আলমের পাশাপাশি সামান্তা শারমিন, আরিফুল ইসলাম আদিব, নাহিদা সারওয়ার নিভা ও আব্দুল হান্নান মাসউদসহ নানা পেশা, অঞ্চল ও সামাজিক অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা তরুণেরা NCP-র প্রতিষ্ঠাকালীন নেতৃত্বে যুক্ত হন। এই বহুমাত্রিক নেতৃত্ব জাতীয় ঐক্য, নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং একটি “দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র”-এর লক্ষ্যে জুলাইয়ের জনআকাঙ্ক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকারে রূপ দেওয়ার প্রত্যয় বহন করে। জুলাইয়ের সাহস এই যাত্রার শক্তি; আর সেই সাহসকে অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক ও নাগরিকমুখী রাজনীতিতে প্রতিফলিত করাই তাদের প্রধান দায়িত্ব।

    সীমানার বাইরে প্রতিরোধ

    দেশের ইন্টারনেট নিভেছিল—প্রবাসীরা কণ্ঠ নিভতে দেয়নি

    দেশের ভেতর থেকে খবর আসা বন্ধ হয়ে গেলে প্রবাসীরা অনুবাদ করেছেন, ভিডিও যাচাই করে ছড়িয়েছেন, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনের দরজায় পৌঁছেছেন, দূতাবাসের সামনে দাঁড়িয়েছেন এবং রেমিট্যান্স বয়কটের ডাক তুলেছেন। ডার্মস্টাডট, ফ্রাঙ্কফুর্ট, হাইডেলবার্গ, স্টুটগার্ট ও লন্ডন থেকে আবুধাবি, দুবাই, দোহা, ডালাস, নিউ ইয়র্ক, মেলবোর্ন ও সিডনি—শহর বদলেছে, কণ্ঠ বদলায়নি। মধ্যপ্রাচ্যে এই সংহতি ছিল বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ: UAE-তে ৫৭ বাংলাদেশি বিক্ষোভ সংগঠনের কারণে কারাদণ্ড পান—পরে ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ তাঁরা রাষ্ট্রপতির ক্ষমা লাভ করেন; কাতারে প্রবাসীরা রাস্তায় নামেন, আর সৌদি আরব ও ওমানে অনেকে রেমিট্যান্স বয়কট ও ডিজিটাল প্রচারে যুক্ত হন।

    স্মৃতি থেকে দায়িত্ব: ২০২৪ সালের সেই বৈশ্বিক সংহতির স্মৃতি, ন্যায়বিচারের দাবি ও নাগরিক দায়িত্ব NCP Diaspora Alliance Germany নতুন প্রজন্মের কাছে বহন করে চলেছে।

    জুলাইয়ের অসমাপ্ত অঙ্গীকার

    সরকারের পতন বিজয়ের শেষ কথা নয়

    নিজে যাচাই করুন

    বিশ্বাস নয়—উৎস খুলে নিজে যাচাই করুন

    এই পাতা একটি প্রবেশদ্বার। পূর্ণ সাক্ষ্য, ভুক্তভোগীর তালিকা, আলোকচিত্র ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন জানতে মূল উৎসগুলো পড়ুন।

    স্মৃতি থেকে দায়িত্ব

    জুলাই শেষ হয়নি—
    যতদিন রাষ্ট্র সত্যিই মানুষের না হয়।

    জুলাইকে স্মরণ করা প্রতিহিংসার আহ্বান নয়। এর অর্থ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করা, প্রতিটি হত্যার নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা, আহত ও শহিদ পরিবারকে মর্যাদা দেওয়া এবং এমন প্রতিষ্ঠান গড়া—যেখানে কোনো সরকার আর গুলি, গুম, আটক বা ইন্টারনেট বন্ধ করে নাগরিকের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে না পারে। স্মৃতি তখনই অর্থবহ, যখন তা ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করে।