রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার যে নিকটবর্তী লক্ষ্য সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, তা এখন পিছিয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম ৩ সেপ্টেম্বর বলেন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পরের ধাপে যেতে দুটি ভালভের জটিলতা বাধা দিচ্ছে। তিনি এও বলেছেন, কেন ভালভ দুটি কাজ করছে না তা নির্ণয়ে রুশ বিশেষজ্ঞ দল আসবে এবং এই মুহূর্তে নতুন কোনো নির্দিষ্ট তারিখ বলা যাচ্ছে না। পারমাণবিক নিরাপত্তার প্রশ্নে এই শেষ কথাটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: অজানা ত্রুটি রেখে সময় মেলানোর চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
কিন্তু নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সঙ্গে তথ্য গোপন রাখার কোনো সম্পর্ক নেই। দেশের সবচেয়ে বড় ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি প্রকল্পের ক্ষেত্রে নাগরিকের ন্যায্য প্রশ্ন হলো—ত্রুটিটি কোন ব্যবস্থায়, সেটি নিরাপত্তার কোন শ্রেণির বিষয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থা কীভাবে দেখছে, মেরামত না বদল কোন পথটি নেওয়া হবে, এবং গ্রিডে বিদ্যুৎ দেওয়ার সংশোধিত পরিকল্পনা কবে জানানো হবে? এই লেখার উদ্দেশ্য ত্রুটিকে দুর্ঘটনা বলা বা কারও দায় স্থির করা নয়। উদ্দেশ্য হলো, একটি প্রকাশ্য সমস্যার সমাধানও কি যথেষ্ট প্রকাশ্যভাবে পরিচালিত হবে?
সরকার কী জানিয়েছে, আর কী জানায়নি
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে মন্ত্রীর বক্তব্যটি বেশ নির্দিষ্ট। ২৮ এপ্রিল জ্বালানি লোডিং শুরুর পর চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে দেওয়ার লক্ষ্য ছিল। পরীক্ষার কয়েকটি ধাপের মধ্যে ‘বি’ ধাপ শেষ হয়েছে, কিন্তু দুটি ভালভে সমস্যা থাকায় ‘সি’ ধাপে যাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর বর্ণনায়, প্রত্যাশিত চাপের সময় ভালভ স্বয়ংক্রিয়ভাবে খোলেনি। তিন জোড়া ভালভের মধ্যে এক জোড়া কাজ করলেও অন্য দুই জোড়ায় সমস্যা দেখা দিয়েছে।
মন্ত্রী বলেছেন, ভালভ খুলে মেরামত, আবার বসানো ও পরীক্ষা করতে এক থেকে দেড় মাস লাগতে পারে। একই সঙ্গে তিনি প্রকল্প-পরিচালক, সংশ্লিষ্ট সচিব, নকশাকারী এবং রাশিয়ার রোসাটমের সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলেছেন। ডেইলি স্টারের স্বাধীন প্রতিবেদনে সমস্যাটি, দুটি ভালভ এবং অনির্দিষ্ট নতুন সময়সূচির বিষয়গুলো মেলে। সেখানে সম্ভাব্য দুই পথও এসেছে: দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য রাখা ভালভ প্রথম ইউনিটে বসানো, অথবা সরবরাহকারীকে নতুন ভালভ দ্রুত তৈরি ও পাঠাতে বলা।
তবে এই তথ্যগুলো সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। প্রকাশ্য প্রতিবেদনে ভালভের নির্মাতা বা মডেল, ত্রুটির প্রকৃত কারণ, কোন পরীক্ষার ফল অস্বাভাবিক ছিল, বিকল্প দুটির মধ্যে কোনটি নিরাপত্তা ও নকশা-অনুমোদনের দিক থেকে গ্রহণযোগ্য, কিংবা নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের লিখিত মূল্যায়নের উল্লেখ নেই। এমন নথি প্রকাশে সংবেদনশীল প্রযুক্তিগত বিবরণ থাকলে তা বাদ দেওয়া যেতে পারে; কিন্তু ঝুঁকির স্তর, নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের অবস্থা এবং সম্ভাব্য সময়সূচির সারাংশ গোপন রাখার কারণ নেই।
এটি বিদ্যুৎ-সংকটের খবর, কিন্তু তার চেয়েও বেশি একটি কমিশনিং পরীক্ষা
রূপপুরকে দৈনন্দিন বিদ্যুতের হিসাবের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। প্রকল্পের সরকারি পৃষ্ঠায় দুটি VVER-1200 ইউনিটের মোট gross ক্ষমতা ২,৪০০ মেগাওয়াট বলা আছে। কিন্তু ক্ষমতা কাগজে লেখা একটি পরিমাপ; উৎপাদন শুরু, গ্রিডে সরবরাহ, ধারাবাহিক বাণিজ্যিক পরিচালনা—এসব আলাদা ধাপ। IAEA-এর PRIS দেশ-তথ্যে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রূপপুর-১ ও রূপপুর-২ উভয়ই ‘under construction’; বাংলাদেশের কোনো চালু পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর নেই।
এখানে ৩০০ মেগাওয়াটের কথাটিও সাবধানে পড়া দরকার। এটি পুরো ১,২০০ মেগাওয়াট ইউনিটের উৎপাদন নয়; মন্ত্রীর বর্ণিত প্রথম গ্রিড-সরবরাহের লক্ষ্য। একইভাবে, চার থেকে ছয় মাসও নিশ্চিত সমাপ্তির তারিখ ছিল না—ফুয়েল-লোডিং শুরুর পর একটি লক্ষ্যকাল। ভালভ-জটিলতার পরে সেই লক্ষ্য আর বাস্তবসম্মত কি না, তা এখনো সরকার বলেনি। তাই ‘প্রকল্প ব্যর্থ’ বা ‘বিদ্যুৎ এসে গেছে’—দুটিই এখন তথ্যের চেয়ে বেশি নিশ্চিত দাবি হবে।
নিরাপত্তার যুক্তি কেন সরকারের পক্ষে শক্তিশালী
সরকারের সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তিটি উপেক্ষা করা যাবে না। ভালভের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থায় অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে পরীক্ষার ধাপ আটকে দেওয়া এবং বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা চাওয়া দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত। মন্ত্রী নিজেই বলেছেন, এমন বিষয়ে তাড়াহুড়া করা যাবে না। IAEA-এর বাংলাদেশ-প্রোফাইলেও রূপপুরকে নির্মাণাধীন প্রকল্প হিসেবে দেখানো হয়েছে; কমিশনিং মানে কেবল সময়সূচির কাজ নয়, নকশা, পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণের পর্যায়।
সুতরাং কারিগরি বিলম্ব মাত্রেই অব্যবস্থাপনার প্রমাণ নয়। জটিল নতুন অবকাঠামোয় পরীক্ষা ব্যর্থ হলে কারণ খুঁজে আবার পরীক্ষা করাই স্বাভাবিক। সরকারের পক্ষে আরও একটি যুক্তি আছে: ত্রুটির কারণ না জেনে নতুন তারিখ দিলে সেটিও ভুল আশ্বাস হতে পারে। এই লেখার দাবি নতুন তারিখ বানিয়ে দেওয়া নয়; দাবি হলো, কোন তথ্য পেলে বাস্তবসম্মত সময়সূচি বলা যাবে, সেটি স্পষ্ট করা।
তবু জবাবদিহির প্রশ্নটি কেন থাকে
নিরাপত্তা অগ্রাধিকার হলে জনতথ্যের মানও বাড়া উচিত। কারণ জনগণকে একই সঙ্গে দুই ধরনের ঝুঁকি সামলাতে হয়। প্রথমটি প্রযুক্তিগত—যা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রকৌশলী ও স্বাধীন নিয়ন্ত্রক। দ্বিতীয়টি জনপরিকল্পনার—বিদ্যুৎ-সরবরাহের পূর্বাভাস, বিকল্প জ্বালানি, ব্যয়-চাপ এবং কোন সরকারি প্রতিশ্রুতির সময় বদলাচ্ছে। প্রথম ঝুঁকির সমাধান প্রকাশ্যে ভোটে ঠিক হবে না; দ্বিতীয়টির জন্য তথ্য ছাড়া সংসদ, গণমাধ্যম ও নাগরিকেরা কাউকে প্রশ্নও করতে পারবেন না।
প্রকাশ্য তথ্যের অভাব আরও একটি বাস্তব সমস্যা তৈরি করে। একই ঘটনা নিয়ে কেউ ‘সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটি’ বলে নিশ্চিন্ত হতে পারেন, কেউ আবার ‘বিপর্যয়’ বলতে পারেন। কোনোটিই যাচাইযোগ্য না হলে গুজব জায়গা নেয়। সরকার যদি বলে দেয় যে কোন নিরাপত্তা-প্রক্রিয়া চলছে, কোন সংস্থা পরীক্ষা করছে, কী ফল হলে পরের ধাপে যাওয়া যাবে, এবং কখন পরের জন-আপডেট দেবে—তাহলে আতঙ্কও কমবে, অযথা রাজনৈতিক বিতর্কও কমবে।
আগের লক্ষ্য ও বর্তমান অবস্থার তুলনা
তুলনাটি এখানে সরল। এপ্রিলের শেষ দিকে জ্বালানি-লোডিং শুরুর পর চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট গ্রিডে দেওয়ার লক্ষ্য বলা হয়েছিল। সেপ্টেম্বরের শুরুতে মন্ত্রী বলছেন, পরীক্ষা এখনো ‘সি’ ধাপে যায়নি এবং নির্দিষ্ট নতুন তারিখ নেই। অর্থাৎ প্রকাশ্য লক্ষ্যের সঙ্গে বাস্তব অবস্থার ফাঁক তৈরি হয়েছে। এর মাত্রা—কত দিন, কত মাস বা কত টাকা—এখন বলা যাবে না, কারণ সরকার নির্দিষ্ট সংশোধিত সময়সূচি বা ব্যয়-প্রভাব প্রকাশ করেনি।
এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। IAEA-এর প্রোফাইলে ২০২৬ ও ২০২৭ সালে প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক পরিচালনার কথা আছে, আবার PRIS-এ দুটি ইউনিট নির্মাণাধীন দেখানো। আন্তর্জাতিক ডেটাবেসের সম্ভাব্য-চালুর বছর এবং মন্ত্রীর বলা ৩০০ মেগাওয়াটের প্রাথমিক গ্রিড-সরবরাহ এক জিনিস নয়। এই দুই সময়রেখা মিলিয়ে কোনো নতুন ‘চূড়ান্ত সময়সীমা’ বানানো ঠিক হবে না। বরং সরকারকে নিজস্ব হালনাগাদ, তারিখযুক্ত সময়রেখা প্রকাশ করতে হবে।
কার লাভ, কার ঝুঁকি
সঠিকভাবে ত্রুটি ধরা পড়ে, যাচাই হয় এবং নিরাপদ সমাধান নেওয়া হলে সবচেয়ে বড় লাভ জননিরাপত্তার। প্রকল্পের কর্মী, আশপাশের মানুষ ও ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎব্যবস্থা—সবার জন্যই এটি প্রয়োজনীয়। আবার সমাধান বিলম্বিত হলে বিদ্যুৎ-পরিকল্পনায় যে সরবরাহ ধরে নেওয়া হয়েছিল তা পিছিয়ে যায়; তখন বিকল্প জ্বালানি, সাশ্রয় পরিকল্পনা বা অন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপের হিসাব প্রাসঙ্গিক হয়। কোন বিকল্পে কত চাপ পড়বে, সে তথ্য এই মুহূর্তে প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি।
সরকার, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ ও সরবরাহকারীর জন্যও স্বচ্ছতা লাভজনক। কারণ কারণ নির্ধারণের আগেই দোষারোপ হলে কারিগরি কাজ কঠিন হয়। কিন্তু একেবারেই নীরব থাকলে সময়, ব্যয় ও তদারকির প্রশ্ন বড় হয়। তাই প্রকাশ্য সারাংশে কোনো ব্যক্তিকে দোষী বলা দরকার নেই; দরকার দায়িত্বের রেখা স্পষ্ট করা—প্রকল্প কর্তৃপক্ষ কী দেখছে, স্বাধীন নিয়ন্ত্রক কী পরীক্ষা করছে, সরবরাহকারী কী কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে, আর মন্ত্রণালয় কোন সিদ্ধান্তের জবাব দিচ্ছে।
এখন কী প্রকাশ করা উচিত
- বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের যাচাইাধীন কি না, সেটিসহ ত্রুটির একটি জনবোধ্য নিরাপত্তা-সারাংশ।
- মেরামত, প্রতিস্থাপন বা দ্বিতীয় ইউনিটের ভালভ ব্যবহারের বিকল্পগুলোর সিদ্ধান্ত-প্রক্রিয়া এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদনের অবস্থা।
- পরের কমিশনিং ধাপে যেতে কোন পরীক্ষা ও কোন মানদণ্ড পূরণ লাগবে—সংবেদনশীল নকশা-তথ্য বাদ দিয়ে তার ব্যাখ্যা।
- গ্রিডে প্রাথমিক সরবরাহ ও বাণিজ্যিক পরিচালনার আলাদা হালনাগাদ সময়সূচি; অনিশ্চয়তা থাকলে তা-ও স্পষ্ট ভাষায়।
- বিলম্বে প্রকল্প ব্যয়, চুক্তি বা জাতীয় বিদ্যুৎ-পরিকল্পনায় প্রভাব পড়লে তার তারিখযুক্ত জন-আপডেট।
এই তথ্যের একটি ব্যবহারিক ধরনও আছে। মাসে অন্তত একবার প্রকল্প কর্তৃপক্ষ, মন্ত্রণালয় ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার যৌথ সংক্ষিপ্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা যেতে পারে। সেখানে ‘নিরাপদে সমাধান হয়েছে’—এ ধরনের অস্পষ্ট বাক্যের বদলে বলা যাবে: কোন পরীক্ষাটি শেষ, কোনটি বাকি, বাইরের বিশেষজ্ঞের মতামত নেওয়া হয়েছে কি না, এবং পরের আপডেটের তারিখ কী। এমন বিজ্ঞপ্তি প্রযুক্তিগত ম্যানুয়াল নয়; এটি জনপরিকল্পনার ন্যূনতম রেকর্ড।
সংসদীয় তদারকিরও এখানে ভূমিকা আছে। প্রকল্পের কারিগরি নকশা বা নিরাপত্তা-বিশ্লেষণের গোপন অংশ প্রকাশ করা সম্ভব না হলেও, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সংসদীয় কমিটিকে নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে সমন্বয়, বিলম্বের পরিকল্পনাগত প্রভাব এবং নতুন জন-তথ্য প্রকাশের সময় নিয়ে অবহিত করতে পারে। এতে প্রকৌশলীর সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হবে না; বরং কে কখন কোন তথ্যের জন্য দায়ী, তার একটি নথিভুক্ত পথ তৈরি হবে।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। পারমাণবিক নিরাপত্তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞ ও আইনগতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত নিয়ন্ত্রকের। কিন্তু প্রকল্পের সময়সূচি বদলালে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপক, অর্থ মন্ত্রণালয়, সংসদ সদস্য, শিল্পগ্রাহক ও সাধারণ পরিবার—সবাই পরিকল্পনার প্রভাব বহন করে। তাই নিরাপত্তা সিদ্ধান্তের ওপর জনচাপ নয়, সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়া ও ফল সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যই জবাবদিহির সঠিক পথ।
সরকারের পরের বিজ্ঞপ্তিতে আরেকটি সীমারেখাও পরিষ্কার থাকা দরকার: প্রকল্প কর্তৃপক্ষের কারিগরি ব্যাখ্যা, রোসাটম বা অন্য সরবরাহকারীর তথ্য, এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বাধীন মূল্যায়ন এক জিনিস নয়। কোন তথ্য কার, কোনটি যাচাই শেষ, আর কোনটি এখনো প্রাথমিক—এভাবে আলাদা করে বললে পরের সংশোধনও সহজ হবে। একটি বড় প্রকল্পের বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু ভালো খবর দেওয়ায় নয়; অনিশ্চয়তা সৎভাবে জানাতেও তৈরি হয়।
এর সঙ্গে বাস্তব ফলের প্রতিবেদনও জরুরি। গ্রিডে প্রথম বিদ্যুৎ গেল কি না, কতক্ষণ পরীক্ষামূলক সরবরাহ চলল, নিরাপত্তা অনুমোদনের কোন ধাপ শেষ হলো এবং বাণিজ্যিক পরিচালনার পরিকল্পনা বদলাল কি না—এসব পরে তারিখসহ জানাতে হবে। আজকের ভালভ-জটিলতার মূল্যায়ন তখনই সম্পূর্ণ হবে, যখন নাগরিকেরা ঘোষিত সমাধানের পর বাস্তব ফল মিলিয়ে দেখতে পারবেন।
বড় ছবিটা কী
রূপপুরের ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, বড় প্রকল্পে ‘চালু হবে’ কথাটির পেছনে বহু ছোট কিন্তু কঠিন পরীক্ষা থাকে। একটি ভালভের সমস্যা ধরা পড়া নিজে কোনো কেলেঙ্কারি বা বিপর্যয়ের প্রমাণ নয়। উল্টোভাবে দেখলে, পরীক্ষায় ত্রুটি ধরা পড়া এবং তা প্রকাশ্যে স্বীকার করা নিরাপত্তা-সংস্কৃতির একটি প্রয়োজনীয় অংশ হতে পারে। কিন্তু সেই সংস্কৃতি পূর্ণ হয় তখনই, যখন সমস্যা থেকে সমাধানে যাওয়ার রেকর্ডটিও জনগণ দেখতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিষয় নয়। IAEA-এর তথ্যে দেশটির এখনো কোনো চালু পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর নেই। ফলে প্রথম ইউনিটের কমিশনিংয়ের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ প্রতিষ্ঠানগত বিশ্বাসযোগ্যতারও পরীক্ষা। নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি নিয়ন্ত্রক স্বাধীনতা, তথ্যের শৃঙ্খলা ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা দেখানোও জরুরি।
উপসংহার
ভালভ-জটিলতার পর রূপপুরকে দ্রুত গ্রিডে তুলতে চাপ দেওয়া উচিত নয়। সরকারের এই সতর্ক অবস্থানকে সমর্থন করার যথেষ্ট কারণ আছে। কিন্তু নাগরিকদের কাছেও একটি ন্যায্য প্রতিশ্রুতি থাকা দরকার: ত্রুটির কারণ নির্ণয়, নিরাপত্তা-পর্যালোচনা, সমাধানের অনুমোদন এবং নতুন সময়সূচি—প্রতিটি ধাপে কী জানা গেল, কখন জানা গেল, তা নিয়মিত জানানো হবে। পারমাণবিক নিরাপত্তায় অন্ধ তাড়াহুড়া বিপজ্জনক; জবাবদিহিতে অন্ধকারও তাই।
তথ্যসূত্র
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে ভালভ-জটিলতা, পরীক্ষার ধাপ, ৩০০ মেগাওয়াট লক্ষ্য ও রুশ বিশেষজ্ঞ-সহায়তার সরকারি বিবরণ—৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- দ্য ডেইলি স্টার: দুটি ভালভের কারণে কমিশনিং বিলম্ব এবং নতুন গ্রিড-সংযোগের নির্দিষ্ট তারিখ না থাকার স্বাধীন প্রতিবেদন—৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প: দুটি VVER-1200 ইউনিট, কমিশনিং ও ট্রায়াল অপারেশনসহ সরকারি প্রকল্প-পরিধি
- আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) PRIS: বাংলাদেশে রূপপুর-১ ও রূপপুর-২ উভয়ই নির্মাণাধীন, কোনো রিঅ্যাক্টর চালু নয়—সর্বশেষ তথ্য ১৪ জুলাই ২০২৬
- IAEA Country Nuclear Power Profiles: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর PRIS-ভিত্তিক বাংলাদেশ প্রোফাইল ও প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক-চালুর প্রেক্ষাপট
