একটি সরকার পড়ে গেলে কি রাষ্ট্রও বদলে যায়? নাহিদ ইসলামের নতুন সাক্ষাৎকার আমাদের এই অস্বস্তিকর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান শেখ হাসিনার সরকারকে সরিয়েছিল। কিন্তু যে নিয়ম, প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতার সংস্কৃতি স্বৈরতন্ত্রকে সম্ভব করেছিল, তার কতটা বদলেছে—দুই বছর পর এখন সেটিই আসল হিসাব।
‘ম্যান্ডেট’ মানে সহজ ভাষায় কী?
এখানে ম্যান্ডেট মানে কোনো ব্যক্তি, দল বা অনির্বাচিত সরকারকে ইচ্ছামতো দেশ চালানোর খালি চেক নয়। জুলাইয়ের ম্যান্ডেট ছিল সীমিত কিন্তু গভীর একটি গণতান্ত্রিক দায়িত্ব: হত্যাকাণ্ড ও নিপীড়নের বিচার, দলীয়করণমুক্ত প্রতিষ্ঠান, ক্ষমতার ভারসাম্য, ভোটের অধিকার, নাগরিক মর্যাদা এবং এমন নিয়ম তৈরি করা—যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যক্তিগত বা দলীয় অস্ত্র বানাতে না পারে।
দুই বছরে নাহিদের চারটি রাজনৈতিক পরিচয়
- বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সংগঠক;
- এক দফা ও গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম দৃশ্যমান মুখ;
- ৮ আগস্ট ২০২৪-এ গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা;
- NCP-র প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক এবং ২০২৬ সালের সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ।
এই পথচলা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়। একই মানুষ রাস্তার দাবি, সরকারের ভেতরের সীমাবদ্ধতা এবং সংসদীয় জবাবদিহি—তিন জায়গাই কাছ থেকে দেখেছেন। তাই তাঁর বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। আবার সেই কারণেই বক্তব্যটি প্রশ্ন ছাড়া মেনে নেওয়া ঠিক হবে না। ক্ষমতার ভেতরে থাকার অভিজ্ঞতা তাঁকে বাড়তি ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় দেয়: সুযোগ কোথায় ছিল, বাধা কে বা কী তৈরি করেছিল, আর কোন সিদ্ধান্ত ভিন্ন হতে পারত?
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্বীকারোক্তি
নাহিদের মূল মূল্যায়ন হলো, ৫ আগস্ট পর্যন্ত যে বিস্তৃত ঐক্য ছিল, সরকার গঠনের পর তা একটি যৌথ রাষ্ট্র-রূপান্তর কর্মসূচিতে পরিণত হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের নির্বাচনী হিসাব ও সাংগঠনিক স্বার্থে ফিরে যায়; ছাত্র নেতৃত্বও একক, জবাবদিহিমূলক কাঠামো ধরে রাখতে পারেনি; আর অন্তর্বর্তী সরকার মানুষের শক্তিকে সংস্কারের অংশগ্রহণমূলক প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার মতো স্পষ্ট কর্মসূচি দিতে ব্যর্থ হয়। ফলে ক্ষমতার শীর্ষ বদলালেও পুরোনো আমলাতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অভ্যাস টিকে থাকে।
কেন সুযোগটি পুরোপুরি ব্যবহার করা যায়নি
- অন্তর্বর্তী সরকার পুরোনো সংবিধান, আইন, প্রশাসন ও নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতর থেকেই কাজ শুরু করেছিল;
- সংস্কারের প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য ছিল আংশিক—নীতির পাশাপাশি নির্বাচন কখন হবে, সেই হিসাব প্রাধান্য পায়;
- জুলাইয়ের অংশগ্রহণকারীদের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থায়ী, স্বচ্ছ নাগরিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি হয়নি;
- আইনশৃঙ্খলা, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান ও আহতদের পুনর্বাসনে ধীরগতি সংস্কারের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয় করেছে;
- রাষ্ট্রের ভেতরের পুরোনো সুবিধাভোগী নেটওয়ার্ককে বদলানোর লক্ষ্য, সময়সূচি ও প্রকাশ্য অগ্রগতি-পরিমাপ যথেষ্ট স্পষ্ট ছিল না।
এসব সীমাবদ্ধতা ব্যর্থতার কারণ বোঝায়; ব্যর্থতাকে মাফ করে না। বিপ্লব-পরবর্তী সরকারের কাজই ছিল সীমাবদ্ধতার ভেতর থেকে অগ্রাধিকার ঠিক করা। সবকিছু একসঙ্গে সম্ভব না হলেও পাঁচটি জরুরি পরিবর্তন বেছে নেওয়া যেত, কে বাধা দিচ্ছে তা বলা যেত, এবং ফল পাওয়ার সময়সীমা প্রকাশ করা যেত। এই রাজনৈতিক যোগাযোগ ও বাস্তবায়নের শৃঙ্খলাই দুর্বল ছিল।
সবই কি ব্যর্থতা? না—কিন্তু শুরু আর সমাপ্তি এক নয়
অন্তর্বর্তী সময়ে সংস্কার কমিশন গঠন, জুলাই জাতীয় সনদ নিয়ে দলীয় আলোচনা, একই দিনে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন ও গণভোট, এবং রাজনৈতিক আলোচনার পরিসর উন্মুক্ত হওয়া—এসব বাস্তব অর্জন। গণভোটে সংস্কারের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতও জনগণের প্রত্যাশাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। কিন্তু একটি কমিশনের প্রতিবেদন বা সনদে স্বাক্ষর রাষ্ট্র বদলায় না; নিয়োগবিধি, বাজেট, পুলিশি আচরণ, আদালতের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার ও সংসদীয় নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন দৃশ্যমান হলেই সংস্কার পূর্ণতা পায়।

সরকারের ভেতরে ছিলেন—তাই নাহিদের দায়ও বেশি
নাহিদ অন্তর্বর্তী সরকারের বাইরের কোনো দর্শক ছিলেন না। তাই ‘সরকার পারেনি’ বলার পাশাপাশি নিজের ভূমিকাটিও তাঁকে ব্যাখ্যা করতে হবে। কোন সংস্কার তিনি উপদেষ্টা পরিষদে তুলেছিলেন? কোনটি কোথায় আটকে গেল? জনগণের জন্য অগ্রগতির তালিকা কেন প্রকাশ করা হয়নি? আজ একই পরিস্থিতিতে তিনি কী আলাদা করতেন? এই প্রশ্নগুলোর সরাসরি উত্তর তাঁর সমালোচনাকে দুর্বল নয়, আরও বিশ্বাসযোগ্য করবে। আত্মসমালোচনাই নতুন রাজনীতিকে পুরোনো দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে আলাদা করতে পারে।
বিপ্লবের ম্যান্ডেট মানে যা নয়
- অনির্দিষ্টকাল অনির্বাচিত শাসন চালানোর অনুমতি নয়;
- জুলাইকে কোনো একটি দল বা নেতার সম্পত্তি বানানোর অধিকার নয়;
- ভিন্নমত, সংখ্যালঘু অধিকার বা আইনের শাসন স্থগিত করার অজুহাত নয়;
- প্রতিপক্ষকে দমন করতে নতুন করে রাষ্ট্রযন্ত্র দলীয়করণের বৈধতা নয়;
- সমালোচনাকে ‘বিপ্লববিরোধী’ বলে থামিয়ে দেওয়ার ঢাল নয়।
ম্যান্ডেটের একমাত্র গণতান্ত্রিক অর্থ হলো—ক্ষমতার নিয়ম বদলানো, যাতে নিজের দল ক্ষমতায় গেলেও একই নিয়ম মানতে বাধ্য হয়। যে সংস্কার শুধু প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে কিন্তু নিজের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে না, সেটি জুলাইয়ের সংস্কার নয়; সেটি পুরোনো রাজনীতির নতুন সংস্করণ।
এখন সংসদে নাহিদ ও NCP কী করতে পারে
২০২৬ সালের সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে নাহিদ এখন আর শুধু আন্দোলনের স্মৃতি বহন করছেন না। তাঁর হাতে আছে সংসদীয় প্রশ্ন, কমিটি, সংশোধনী, ভোটের রেকর্ড এবং সরকারি ব্যয় তদারকির সুযোগ। জুলাইয়ের দাবি স্লোগান থেকে আইনে নিতে NCP সাতটি মাপযোগ্য অঙ্গীকার সামনে আনতে পারে।
- জুলাই সনদ ও গণভোটে অনুমোদিত প্রতিটি সংস্কারের জন্য ধারা, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ও সময়সীমাসহ প্রকাশ্য বাস্তবায়ন-ট্র্যাকার;
- পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন নিয়োগ এবং সংসদীয় জবাবদিহির আইন;
- জুলাইয়ের শহীদ, আহত ও নিখোঁজদের যাচাইকৃত একক তালিকা, চিকিৎসা-পুনর্বাসন এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নিয়মিত প্রকাশ্য অগ্রগতি;
- প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমা, সংসদীয় কমিটিতে বিরোধীদের কার্যকর নেতৃত্ব এবং স্বাধীন বিচার বিভাগের নিশ্চয়তা;
- নির্বাচিত ও আর্থিকভাবে সক্ষম স্থানীয় সরকার—যাতে সব সিদ্ধান্ত ঢাকায় আটকে না থাকে;
- যুব কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে ব্যয় ও ফলাফলভিত্তিক বার্ষিক লক্ষ্য;
- নিজ দলের অর্থায়ন, প্রার্থী নির্বাচন, অভ্যন্তরীণ ভোট, স্বার্থের সংঘাত এবং সংসদে প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ভোটের পূর্ণ প্রকাশ।
সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ কোথায়?
রাষ্ট্র সংস্কার কোনো দূরের সাংবিধানিক শব্দ নয়। থানায় অভিযোগ দিলে ঘুষ না লাগা, চাকরিতে দলীয় পরিচয় না দেখা, আদালতে সময়মতো বিচার, বাজারে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, গ্রামের বাজেট গ্রামেই ঠিক করা এবং সরকারের সমালোচনা করে নিরাপদে বাড়ি ফেরা—এগুলোই সংস্কারের দৈনন্দিন রূপ। মানুষের জীবনে এই পরিবর্তন না এলে ‘ম্যান্ডেট’ ও ‘সনদ’ শুধু রাজনৈতিক ভাষণ হয়ে থাকবে।
শেষ কথা: জুলাইকে স্মৃতিতে নয়, রাষ্ট্রের নিয়মে লিখতে হবে
নাহিদ ইসলামের সাক্ষাৎকারের শক্তি এখানেই—তিনি বিজয়ের স্মৃতিকে আত্মতুষ্টির গল্প বানাননি। তিনি মানছেন, সুযোগ ছিল এবং তার একটি অংশ হারিয়েছে। এখন কাজ আরও কঠিন: হারানো সুযোগ নিয়ে অনন্ত অভিযোগ না করে সংসদ, আইন, দলীয় সংগঠন ও জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে বাকি কাজ এগিয়ে নেওয়া। জুলাই একটি সরকারকে বিদায় দিয়েছিল। জুলাইয়ের রাজনীতি সফল হবে সেদিন, যেদিন কোনো ভবিষ্যৎ সরকার আর স্বৈরতন্ত্রের একই যন্ত্র হাতে পাবে না।
সম্পাদকীয় নোট: সাক্ষাৎকারের সরাসরি উদ্ধৃত বাক্যটি Daily Waadaa-র প্রকাশিত ক্যাপশন থেকে নেওয়া। বাকি অংশ সাক্ষাৎকারের বক্তব্যের প্রাসঙ্গিক সারাংশ ও স্বাধীন বিশ্লেষণ; তথ্য ৪ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশিত উৎস দিয়ে যাচাই করা হয়েছে।
তথ্যসূত্র
- Daily Waadaa: নাহিদ ইসলামের পূর্ণ সাক্ষাৎকার—‘The revolution had a mandate’
- প্রথম আলো: জুলাইয়ের পর সবাই নিজের এজেন্ডায় ফিরে গেছে—নাহিদ ইসলাম
- Dhaka Stream: The path we take will shape Bangladesh’s politics and future
- The Daily Star: নাহিদ ইসলাম বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ
- Election Commission/BSS: জুলাই সনদ গণভোটের সংশোধিত গেজেট
- bdnews24.com: জুলাই সনদের ৮৪টি সংস্কার অঙ্গীকার ও গণভোটের ফল
- IFES: Bangladesh 2026 election and referendum background
- Al Jazeera: অন্তর্বর্তী সরকারের অর্জন ও ব্যর্থতা নিয়ে নাহিদের মূল্যায়ন
