সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট ধীরে ধীরে কাটবে। কিন্তু একই দিনের সরকারি গ্রিড-তথ্য বলছে, ১০ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টায় চাহিদা ছিল ১৬,৩৪৫ মেগাওয়াট, সরবরাহ ১২,৭৮৮ মেগাওয়াট; ফাঁক ৩,৫৫৭ মেগাওয়াট। সন্ধ্যা ৭টাতেও ঘাটতি ছিল ৩,০২১ মেগাওয়াট। আশ্বাসের প্রয়োজন আছে, কিন্তু এত বড় ঘাটতির সময় মানুষের দরকার আশ্বাসের সঙ্গে তারিখ, পরিমাণ ও দায়বদ্ধতার হিসাব।
এটি কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতির হিসাব নয়। ঘাটতি মানে বাসা, দোকান, কারখানা, হাসপাতাল ও ক্ষুদ্র ব্যবসার অনিশ্চয়তা। এক ঘণ্টার বিদ্যুৎ-ফাঁক থেকে কার কত ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না, তা সরাসরি বলা যায় না; বিতরণব্যবস্থা ও এলাকা ভেদে অভিজ্ঞতা আলাদা। তবু জাতীয় গ্রিডে একসঙ্গে কয়েক হাজার মেগাওয়াটের চাহিদা অপূর্ণ থাকা সেই অনিশ্চয়তার সরকারি, পরিমাপযোগ্য সংকেত।
সংখ্যাটি কী বলে, কী বলে না
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির অনলাইন টেবিলে ১০ সেপ্টেম্বরের প্রতি ঘণ্টার চাহিদা, সরবরাহ ও লোডশেডিং দেখানো আছে। দুপুর ১টায় ফাঁক ছিল ৩,০৫১ মেগাওয়াট, বিকেল ২টায় ৩,১২৭, বিকেল ৩টায় ৩,৫৫৭ এবং বিকেল ৪টায় ৩,৩৫০ মেগাওয়াট। রাতে পরিস্থিতি বদলালেও ফাঁক শেষ হয়নি। এই ডেটা থেকে কোনো নির্দিষ্ট কর্মকর্তা ব্যর্থ বা কোনো একটি জ্বালানি উৎস এককভাবে দায়ী—এমন রায় দেওয়া যায় না। কিন্তু এটি স্পষ্ট করে যে সংকটটি ঘোষণার ভাষা নয়, অপূর্ণ সরবরাহের বাস্তবতা।
একই সংস্থার উৎপাদন-বিবরণীতে ১০ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন ৪,৬০১ মেগাওয়াট দেখানো হয়েছে; তরল জ্বালানি ১,৫৫৩, কয়লা ৪,৭৫২, সৌর ৬২৮ এবং ভারত ও নেপাল থেকে আমদানি মিলিয়ে ১,০৯৯ মেগাওয়াট। এই বিন্যাস বোঝায়, সমাধান শুধু একটি কেন্দ্র চালুর নাম নয়। গ্যাস, আমদানি, জ্বালানি তেল, সঞ্চালন এবং বিতরণ—সব কটি স্তরের বাস্তব সীমা প্রকাশ না করলে মানুষ জানবে না কোন প্রতিশ্রুতি কোন বাধার মুখে।
তথ্য প্রকাশের ন্যূনতম শৃঙ্খলাটিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি সংখ্যা কখনের, কোন মাপার বিন্দুর, এবং আগের দিনের তুলনায় কেন বদলাল—এসব না বললে মানুষ ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। পাওয়ার গ্রিডের টেবিলে দেওয়া ফাঁকটি সাবস্টেশন-পক্ষের চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান। সেটিকে ‘সারাদেশে ঠিক এত মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে’ বলে বাড়িয়ে বলা ঠিক নয়। আবার এই পার্থক্যকে অপ্রাসঙ্গিক বলে উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। সঠিক ভাষা হলো: প্রকাশিত জাতীয় পরিচালন-তথ্যে সে মুহূর্তে এই পরিমাণ চাহিদা অপূর্ণ ছিল। সরকারের প্রতিদিনের বিবৃতিতেও এই একই সততা দরকার।
এখানে একটি সহজ তুলনা জনসেবার প্রশ্নটি পরিষ্কার করে। বিকেল ৩টার ৩,৫৫৭ মেগাওয়াট ফাঁক রাত ৭টায় ৩,০২১ মেগাওয়াটে নেমেছিল, অর্থাৎ চার ঘণ্টায় ব্যবধান ৫৩৬ মেগাওয়াট কমেছে। এটিকে উন্নতির স্থায়ী প্রমাণ বলা যায় না; ঘণ্টাভেদে চাহিদা ও সরবরাহ দুটিই বদলায়। কিন্তু এই ধরনের তুলনাই দেখায় কেন সরকারকে প্রতিদিন একই সূচকে সকাল, বিকেল ও রাতের ফল প্রকাশ করতে হবে। তাহলে নাগরিক, সাংবাদিক এবং সংসদ সদস্যরা জানতে পারবেন পরিবর্তনটি জ্বালানি যোগ হওয়া, চাহিদা কমা, সঞ্চালন মেরামত, নাকি সাময়িক লোড ব্যবস্থাপনার ফল।
গ্যাসের দরজাও বন্ধ রাখা হয়েছে
সংকটের আরও কঠিন দিক হলো নতুন চাহিদা সামলানোর জায়গা। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ১০ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ১৪ জুলাই পেট্রোবাংলাকে নতুন গ্যাস-সংযোগ এবং বিদ্যমান সংযোগে লোড বৃদ্ধি স্থগিত রাখতে লিখেছে। প্রতিবেদনে বিভাগের চিঠির কথা বলা হয়েছে এবং কারণ হিসেবে দেশীয় উৎপাদন কমা ও এলএনজি অবকাঠামোর সীমার কথা এসেছে। সরকারি চিঠিটি নিজে প্রকাশ্যে সহজে পাওয়া যায়নি; তাই এর সব শর্তকে আমরা স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি বলছি না। কিন্তু বিভাগটি যদি এই নীতি কার্যকর করে থাকে, তবে কোন খাতে কত আবেদন আটকে আছে এবং কত দিন তা চলবে—তা প্রকাশ করা অনিবার্য।
নতুন সংযোগ বন্ধের সিদ্ধান্ত কখনও কখনও সীমিত সরবরাহ সামলানোর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হতে পারে। অনিরাপদভাবে সবাইকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরে কাউকেই সেবা না দেওয়ার চেয়ে বাস্তব সীমা স্বীকার করা ভালো। কিন্তু এখানেই জবাবদিহির প্রশ্ন: কোন হাসপাতাল, শিল্প, সারকারখানা, আবাসিক এলাকা বা ক্ষুদ্র ব্যবসা কী অগ্রাধিকার পাচ্ছে? কতটুকু গ্যাস দরকার, এখন কতটুকু মিলছে, এবং ঘাটতি কমাতে কোন তারিখে কী সক্ষমতা যুক্ত হবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য নতুন গোপন কমিটি বানাতে হয় না। বিদ্যুৎ বিভাগের নিয়ন্ত্রণকক্ষ, পাওয়ার গ্রিডের পরিচালন-তথ্য, পেট্রোবাংলার সরবরাহ পরিকল্পনা এবং বিতরণ কোম্পানিগুলোর অভিযোগ-তথ্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থায় ইতিমধ্যেই থাকে। কাজটি হলো সেগুলোর মধ্যে জনস্বার্থে প্রকাশযোগ্য অংশ এক জায়গায় আনা। কারও ব্যক্তিগত সংযোগ, ঠিকানা বা বাণিজ্যিক দর প্রকাশের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন কেবল খাতভিত্তিক চাহিদা, বরাদ্দ, মুলতবি আবেদন, পরিকল্পিত সক্ষমতা এবং বাস্তব ফলের সমষ্টিগত হিসাব।
এই স্বচ্ছতা শিল্পের বিরুদ্ধেও নয়। কারখানার মালিক যদি জানেন আগামী দুই সপ্তাহে গ্যাস-সরবরাহের সম্ভাব্য সীমা কী, তিনি উৎপাদন, শ্রমিকের শিফট ও বিকল্প জ্বালানির পরিকল্পনা করতে পারেন। দোকান, হাসপাতাল ও পরিবারের ক্ষেত্রেও একই কথা। অনিশ্চয়তা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে তখন, যখন বাস্তব ঘাটতি আছে কিন্তু তার নিয়ম ও সময়সীমা জানা যায় না। তাই সংকট-তথ্য প্রকাশ কেবল সমালোচকদের জন্য অস্ত্র নয়; এটি সরকারকে অগ্রাধিকার ঠিক করার এবং অর্থনীতিকে কম ক্ষতিতে চলার হাতিয়ার দেয়।
সরকারের ব্যাখ্যা উপেক্ষা করা যাবে না
১০ সেপ্টেম্বর সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে শুরু হয়ে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত করেছে। তিনি দীর্ঘদিন দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে ব্যর্থতা এবং আমদানিনির্ভর ব্যবস্থার কথাও বলেছেন। এই বক্তব্যে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা আছে। বৈশ্বিক সরবরাহ-ধাক্কা এবং আগের দশকের বিনিয়োগ-ঘাটতি এক দিনের মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্তে তৈরি হয়নি। বর্তমান সরকারকে তাই উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া দুর্বলতা ও নতুন বাহ্যিক চাপ—দুইটাই সামলাতে হচ্ছে।
কিন্তু উত্তরাধিকার ও যুদ্ধ ব্যাখ্যা, মুক্তিপত্র নয়। ক্ষমতায় থাকার অর্থই হলো সীমার মধ্যে অগ্রাধিকার নির্ধারণ, কেনাকাটা ও মেরামতের সময়সূচি ঠিক করা, এবং সেই সিদ্ধান্তের ফল দেখানো। বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়েবসাইটে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নানা নোটিশ ও প্রকল্প-পর্যালোচনার খবর আছে। সেখানে প্রতিদিনের ঘাটতি থেকে পুনরুদ্ধারের একটি একীভূত, জনবোধ্য রোডম্যাপ নেই। বিচ্ছিন্ন খবর দিয়ে নাগরিক বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিজের আগামী সপ্তাহের পরিকল্পনা করতে পারে না।
সরকারের নিজের অবস্থান পরীক্ষা করারও এটাই সবচেয়ে ন্যায্য পদ্ধতি। যদি যুদ্ধজনিত সরবরাহ-ধাক্কা প্রধান কারণ হয়, তাহলে কোন আমদানি বা টার্মিনাল-সীমা কবে স্বাভাবিক হবে তা বলা সম্ভব হওয়া উচিত। যদি পুরোনো দেশীয় অনুসন্ধান-ঘাটতি প্রধান কারণ হয়, তাহলে নতুন অনুসন্ধান, কূপ মেরামত বা বিকল্প জ্বালানি কী ফল দেবে এবং কখন দেবে তার লক্ষ্য থাকা উচিত। কোনো লক্ষ্য সময়মতো না এলে সরকার তার কারণও ব্যাখ্যা করতে পারে। গোপন রাখা হলে কেবল সন্দেহ বাড়ে; মাপা লক্ষ্য থাকলে ব্যর্থতা ও সাফল্য দুটিই প্রমাণ করা যায়।
এখানে সংসদের ভূমিকা বিশেষ জরুরি। ১০ সেপ্টেম্বরের অধিবেশন শেষ হওয়ার সরকারি নোটিশ আছে, অর্থাৎ এই দফার আলোচনার সময় শেষ। কিন্তু প্রশ্ন শেষ হয়নি। পরবর্তী অধিবেশনে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের কাছে একই বিন্যাসে লিখিত উত্তর চাওয়া যেতে পারে: গত সাত দিনে সর্বোচ্চ ফাঁক কত, কোন দিন কোন সরবরাহ কমেছে, কত নতুন সংযোগ বা লোড-বৃদ্ধি আবেদন আটকে আছে, এবং আগামী ৩০ দিনে কোন পদক্ষেপে কতটুকু ঘাটতি কমবে। সংসদীয় প্রশ্নের উত্তর যদি প্রকাশ্য নথিতে রূপ নেয়, সেটি মন্ত্রণালয়ের প্রতিশ্রুতিকে মাপার শুরু হবে।
এনসিপির সমালোচনা একটি রাজনৈতিক অবস্থান; তথ্যের পরীক্ষা আলাদা
৯ সেপ্টেম্বর বরিশালে এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, সরকার গ্যাস ও বিদ্যুৎ ‘বাদ দিয়ে’ দেশকে পেছনে নেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রথম আলো তাঁর বক্তব্য ও অনুষ্ঠানের বিবরণ প্রকাশ করেছে। এটি একটি যাচাইযোগ্য রাজনৈতিক বক্তব্য, বিদ্যুৎ-নীতি নিয়ে এনসিপির প্রকাশ্য অবস্থানও বটে। কিন্তু বক্তব্যটির রূপক ভাষাকে আমরা প্রমাণিত কারণ হিসেবে নিচ্ছি না। এর তথ্যভিত্তিক অংশ হলো সরকারি গ্রিডে বড় ঘাটতি আছে এবং গ্যাস-সংযোগ সীমিত করার সংবাদ এসেছে; সংকটের প্রতিটি কারণ বা দায় এক বাক্যে মিটে যায় না।
তবু বিরোধী দলের কাজ কেবল রসিকতা করা নয়, নথি চাওয়া। এই জায়গায় এনসিপি সংসদে এবং জনপরিসরে পাঁচটি নির্দিষ্ট হিসাব চাইতে পারে: দৈনিক চাহিদা-সরবরাহ ফাঁক, এলাকা ও খাতভিত্তিক লোড ব্যবস্থাপনা, এলএনজি টার্মিনাল ও কার্গোর কার্যকর সক্ষমতা, নতুন গ্যাস-সংযোগ স্থগিতের তালিকা ও ব্যতিক্রম, এবং প্রতি সপ্তাহের পুনরুদ্ধার লক্ষ্যমাত্রা। সরকার তথ্য দিলে দাবি পরীক্ষা করা যাবে; না দিলে সমালোচনাই শক্তিশালী হবে।
এনসিপির পক্ষে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা হবে এই প্রশ্নগুলোকে যাচাইযোগ্য প্রতিশ্রুতিতে নামিয়ে আনা। ‘সংকট শেষ করুন’ বলা সহজ, কিন্তু তাতে অগ্রগতি মাপা যায় না। বরং ‘সাত দিনে ড্যাশবোর্ড’, ‘৩০ দিনে প্রথম বাস্তব-ফল প্রতিবেদন’ এবং ‘প্রতিটি স্থগিত সংযোগের খাতভিত্তিক সংখ্যা’—এ ধরনের দাবি মানা হয়েছে কি না সহজে দেখা যায়। সরকারি দলের প্রতিশ্রুতি আর বিরোধী দলের সমালোচনা তখন একই প্রমাণের সামনে দাঁড়াবে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সেটিই নাগরিকের লাভ।
ঘোষণা নয়, ৩০ দিনের খোলা পরিকল্পনা
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে আগামী সাত দিনের মধ্যে একটি দৈনিক ড্যাশবোর্ড চালু করতে হবে। সেখানে জাতীয় চাহিদা, সরবরাহ, অপরিবেশিত চাহিদা, উৎপাদন উৎসভিত্তিক অবদান, পরিকল্পিত ও আকস্মিক কেন্দ্র-বিভ্রাট, আমদানি, এবং অঞ্চলভিত্তিক ব্যবস্থাপনার সারাংশ থাকবে। নিরাপত্তা বা বাণিজ্যিক গোপনীয়তার অজুহাতে ব্যক্তিগত গ্রাহক বা দর-কষাকষির তথ্য প্রকাশের প্রয়োজন নেই। কিন্তু সমষ্টিগত সংখ্যা লুকিয়ে রাখার যুক্তিও নেই।
একই সঙ্গে পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগকে গ্যাস-সংযোগ স্থগিতের লিখিত আদেশ, খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার, মুলতবি আবেদনের সংখ্যা এবং পরবর্তী পর্যালোচনার তারিখ প্রকাশ করতে হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের কাছে ৩০ দিনের জন্য সপ্তাহভিত্তিক সরবরাহ-লক্ষ্য এবং প্রত্যেক সপ্তাহের বাস্তব ফলও চাই। লক্ষ্য পূরণ না হলে কারণ জানাতে হবে; পূরণ হলে মানুষও তা দেখতে পাবে।
প্রথম প্রকাশিত সারণিতে অন্তত ছয়টি প্রশ্নের উত্তর থাকা উচিত। গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ চাহিদা কত ছিল? সর্বনিম্ন সরবরাহ কখন ছিল? কোন উৎসের উৎপাদন বা আমদানি পরিকল্পনার চেয়ে কমেছে? কোন অঞ্চলে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা দরকার হয়েছে? নতুন গ্যাস-সংযোগ ও লোড বৃদ্ধির কত আবেদন অপেক্ষায় আছে? এবং পরের সাত দিনে কোন কাজ শেষ হলে কতটুকু বাড়তি বিদ্যুৎ বা গ্যাস মিলবে? এগুলো প্রযুক্তিবিদদের জন্য গোপন সূত্র নয়; নাগরিকের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক হিসাব।
ড্যাশবোর্ডটি নিখুঁত না হলেও প্রকাশ শুরু করা উচিত। প্রথম সপ্তাহে কোনো সংখ্যা সংশোধন লাগলে সেটি সংশোধিত বলে দেখানো যাবে, সঙ্গে কারণ ও আগের সংস্করণ রাখা যাবে। এতে ভুল ঢাকার বদলে সংশোধনের সংস্কৃতি তৈরি হয়। প্রকাশ না করার ঝুঁকি বড়: তখন গুজব, বিচ্ছিন্ন অভিজ্ঞতা এবং দলীয় পাল্টাপাল্টি দাবিই তথ্যের জায়গা দখল করে। বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো মৌলিক সেবায় সরকারকে সেই শূন্যতা তৈরি করার সুযোগ দেওয়া যায় না।
এই প্রকাশনা ব্যবস্থার মালিকানা মন্ত্রণালয়েরই থাকবে। স্বাধীন সাংবাদিক, বিরোধী দল বা ভোক্তা সংগঠন তখন একই তথ্য দেখে প্রশ্ন তুলতে পারবে, আর মন্ত্রণালয়ও ভুল ব্যাখ্যা হলে মূল টেবিল দেখিয়ে জবাব দিতে পারবে। যাচাইযোগ্য তথ্য সরকারের সক্ষমতাকে দুর্বল করে না; বরং কথার বদলে কাজের প্রমাণ দেয়।
সংকট অস্বীকার করলে বিদ্যুৎ আসে না। আবার কেবল যুদ্ধ বা অতীতের ব্যর্থতার দিকে আঙুল তুললেও দোকানের ফ্রিজ, কারখানার শিফট বা হাসপাতালের ওয়ার্ড চলে না। ১০ সেপ্টেম্বরের ৩,৫৫৭ মেগাওয়াট ফাঁক সরকারকে একটি সোজা পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে: কত দিন, কত মেগাওয়াট এবং কোন নথিতে মানুষ সমাধান দেখতে পাবে? সেই উত্তর প্রকাশ্য না হওয়া পর্যন্ত ‘ধীরে ধীরে’ কোনো পরিকল্পনা নয়, শুধু প্রতিশ্রুতি।
তথ্যসূত্র
- পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি: ১০ সেপ্টেম্বরের ঘণ্টাভিত্তিক চাহিদা, সরবরাহ ও লোডশেডিং তথ্য
- পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি: ১০ সেপ্টেম্বরের উৎসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আমদানি তথ্য
- বিদ্যুৎ বিভাগ: সরকারি নোটিশ, সেবা-তথ্য ও ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড: ১০ সেপ্টেম্বর সংসদে প্রধানমন্ত্রীর গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের বক্তব্য
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড: জ্বালানি বিভাগের ১৪ জুলাইয়ের চিঠি উদ্ধৃত করে নতুন গ্যাস-সংযোগ ও লোড বৃদ্ধি স্থগিতের প্রতিবেদন
- প্রথম আলো: বরিশালে নাহিদ ইসলামের গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে বক্তব্য ও এনসিপির অবস্থান, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
