জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দাবি ছিল না—একটি গোষ্ঠীর জবাবদিহিহীন ক্ষমতার জায়গায় আরেকটি গোষ্ঠী বসবে। এর গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি ছিল আরও বড়: রাষ্ট্র নাগরিকের কাছে জবাবদিহি করবে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সমান অধিকার পাবে এবং কোনো দল আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না। এখন এই মানদণ্ডেই বিএনপি-সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারকে বিচার করতে হবে; একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হবে বিকল্প হতে চাওয়া এনসিপিসহ প্রতিটি বিরোধী দলের ক্ষেত্রেও।
সংখ্যাগুলো আত্মতুষ্টির সুযোগ দেয় না
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (HRSS) ২০২৬ সালের জানুয়ারি–মার্চে অন্তত ৬১০টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৩৬ জন নিহত এবং ৪,০৭৮ জন আহত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করেছে। সংস্থাটির বিশ্লেষণে, ৬১০টির মধ্যে ৫৭৩টি—অর্থাৎ ৯৪ শতাংশ—ঘটনা ছিল বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল অথবা বিএনপির সঙ্গে অন্য দলের সংঘর্ষ। এগুলো গণমাধ্যম, HRSS-এর নিজস্ব তথ্য ও ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিংয়ের ভিত্তিতে তৈরি পর্যবেক্ষণ; আদালতের রায় নয়। তবু এর ব্যাপ্তি সরকারের কাছে স্বচ্ছ জবাব দাবি করে।
নির্বাচনের পরও প্রবণতাটি থামেনি। জুনে HRSS ৫৮টি ঘটনায় ৯ জন নিহত ও ৩৪৬ জন আহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলের ২১টি, বিএনপি–জামায়াতের ৮টি, বিএনপি–আওয়ামী লীগের ১৪টি এবং বিএনপি–এনসিপির ৫টি সংঘর্ষ ছিল। এমন ধারাবাহিকতাকে বিচ্ছিন্ন স্থানীয় বিরোধ বলে এড়ানো যায় না। জননিরাপত্তা ফিরিয়ে আনা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
সরকারের সমালোচনা কেন যুক্তিসঙ্গত
সরকারের প্রথম ১০০ দিন নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের মূল্যায়নে কিছু ইতিবাচক সদিচ্ছার কথা বলা হলেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জবাবদিহি থেকে পিছিয়ে যাওয়ার লক্ষণও তুলে ধরা হয়েছে। দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ, স্থানীয় সরকারের স্বায়ত্তশাসন দুর্বল হওয়া, মব সহিংসতা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা এবং মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা সংকুচিত হতে পারে—এমন প্রস্তাব নিয়ে TIB উদ্বেগ জানিয়েছে। এগুলো বিরোধী দলের স্লোগান নয়; সরকারের কাছ থেকে বিষয়ভিত্তিক উত্তর দাবি করা সুনির্দিষ্ট শাসনগত সতর্কতা।
সরকারের পরীক্ষা তাই পরিমাপযোগ্য: রাজনৈতিক হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত; গুরুত্বপূর্ণ মামলার অগ্রগতি প্রকাশ; আয়োজকের পরিচয় না দেখে শান্তিপূর্ণ সভার নিরাপত্তা; পুলিশ ও প্রশাসনকে দলীয় নির্দেশের বাইরে রাখা; এবং সংস্কারের প্রতিশ্রুতি সাংবিধানিক, স্বচ্ছ ও সময়বদ্ধ প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন। নীরবতা, বেছে বেছে ব্যবস্থা নেওয়া কিংবা পূর্বসূরিদের দোষ দেওয়া—কোনোটিই ফলাফলের বিকল্প নয়।
হবিগঞ্জ: অভিযোগ নয়, প্রমাণে দায় নির্ধারণ হোক
২৮ জুলাই হবিগঞ্জে এনসিপির জুলাই পদযাত্রার পর দলটি অভিযোগ করেছে, ছাত্রদল কর্মীদের হামলায় নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারী, সারজিস আলমসহ অনেকে আহত হন; সাংবাদিকদের একটি গাড়িও ভাঙচুরের শিকার হয়। পুলিশ হামলার ঘটনা নিশ্চিত করেছে, অন্যদিকে স্থানীয় যুবদল নেতা সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন। দায়িত্বশীল অবস্থান হলো—অভিযোগকে মুছে না ফেলা, আবার রায় হিসেবেও না লেখা। ভিডিও সংরক্ষণ, হামলাকারী শনাক্ত, তদন্তের অগ্রগতি প্রকাশ এবং সাক্ষী ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের কাজ।
জোটের পুনর্বিন্যাস মানেই ষড়যন্ত্রের প্রমাণ নয়
খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ১১ দলীয় জোটের কর্মসূচি থেকে সরে গেছে; একই সময়ে কওমি ধারার সাতটি দল কাছাকাছি চলার সম্ভাবনা নিয়ে নীতিগত আলোচনা শুরু করেছে। জামায়াত এই পরিবর্তনকে সরকারি ষড়যন্ত্র বলেছে, কিন্তু উদ্যোগের আয়োজকেরা অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন। সরকারের নির্দেশনায় এটি ঘটেছে—এমন প্রকাশ্য প্রমাণ এখনো নেই। রাজনৈতিক অভিযোগ ও প্রমাণিত সত্যের পার্থক্য রক্ষা করাই দায়িত্বশীল রাজনীতি।
তবে এই পুনর্বিন্যাস প্রতিটি জোটকে—এনসিপিকেও—একটি শিক্ষা দেয়। জোট টেকে পারস্পরিক সম্মান, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত ও স্পষ্ট নীতিগত সীমারেখায়; বড় শরিকের একক আধিপত্যে নয়। এনসিপির উচিত জনগণকে পরিষ্কারভাবে বলা—কোন বিষয়ে সহযোগিতা করবে, কোথায় তার ‘রেড লাইন’, এবং জুলাই সনদ, অর্থনৈতিক সুযোগ ও জবাবদিহিমূলক সরকারকেন্দ্রিক নিজস্ব কর্মসূচি কীভাবে অক্ষুণ্ণ রাখবে।
এনসিপির জবাব হবে শৃঙ্খলিত, প্রতিশোধমূলক নয়
- কেন্দ্র থেকে স্থানীয় ইউনিট পর্যন্ত যাচাইকৃত incident-response ব্যবস্থা গড়ে ভিডিও, সাক্ষ্য, চিকিৎসা প্রতিবেদন ও মামলার নম্বর সংরক্ষণ করা।
- কর্মীদের সংঘাত প্রশমন, আইনসংগত আত্মরক্ষা, প্রাথমিক চিকিৎসা ও আইনি প্রক্রিয়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া; প্রতিশোধমূলক সহিংসতা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করা।
- প্রতিটি অভিযোগ প্রমাণসহ প্রকাশ করা এবং কোনটি দলীয় দাবি, কোনটি পুলিশের নিশ্চিত তথ্য, আর কোনটি এখনো যাচাই হয়নি—তা স্পষ্ট করা।
- অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, স্বচ্ছ অর্থায়ন ও মতপার্থক্য সমাধানের ন্যায্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, যাতে বাইরের চাপ বিভক্তি তৈরি করতে না পারে।
- শুধু এনসিপি কর্মী নয়—প্রতিটি নাগরিকের নিরাপদ রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা করা এবং কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও জনসেবায় বাস্তব বিকল্প দেওয়া।
পুরোনো ক্ষমতার রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী জবাব তার অনুকরণ নয়। এনসিপি যদি প্রতিটি বিরোধকে ষড়যন্ত্র বলে, মিত্রের অন্যায় এড়িয়ে যায় কিংবা প্রতিশোধের ভাষা ব্যবহার করে, তাহলে জুলাই যে নৈতিক স্বাতন্ত্র্য তৈরি করেছে তা ক্ষয় হবে। সাহসের সঙ্গে প্রমাণ, প্রতিরোধের সঙ্গে আইন এবং সংগঠনের সঙ্গে জনজবাবদিহি যুক্ত করতে হবে।
এক আধিপত্যের বদলে আরেক আধিপত্য নয়
কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসানে বাংলাদেশ অসাধারণ মূল্য দিয়েছে। সেই আত্মত্যাগের উদ্দেশ্য ভয়, চাঁদাবাজি ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার সুবিধাভোগী বদলানো ছিল না। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারকে প্রমাণ করতে হবে—বিরোধীরা নিরাপদে সংগঠিত হতে পারবে এবং ন্যায়বিচার দলীয় পরিচয়ে নির্ধারিত হবে না। জামায়াত ও তার শরিকদের প্রমাণ করতে হবে—জোটের রাজনীতি মতভিন্নতাকে সম্মান করে। এনসিপিকে প্রমাণ করতে হবে—আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া দল প্রতিরোধের সঙ্গে গণতান্ত্রিক সংযম ও নীতিগত দক্ষতা মিলিয়ে চলতে পারে।
সম্পাদকীয় নোট: এই লেখায় দলীয় বক্তব্যকে অভিযোগ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে। HRSS-এর সংখ্যা পর্যবেক্ষণভিত্তিক তথ্য এবং TIB-এর বক্তব্য প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন। অপরাধের চূড়ান্ত দায় কেবল স্বাধীন তদন্ত ও যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হতে পারে।
