NCP Diaspora Alliance GermanyNCP Diaspora Alliance Germanyমূল ওয়েবসাইট →

সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ

প্রশ্নের মুখোমুখি, মানুষের পক্ষে: নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর সাক্ষাৎকারে নতুন রাজনীতির ভাষা

সম্পাদকীয় ডেস্ক · ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ছাগল, গাড়ি ও ব্যক্তিগত অভিযোগের বিতর্ক পেরিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী আলোচনাকে ফিরিয়েছেন মানুষের আসল প্রশ্নে—চাকরি কোথায়, বাজারের চাপ কমছে না কেন, কৃষক সার পাচ্ছেন কি না এবং সরকারের প্রতিশ্রুতির ফল কী?

সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী

সাংবাদিকদের মুখোমুখি নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী। ছবি: S.M.M.Musabbir Uddin; CC BY-SA 4.0, Wikimedia Commons; ওয়েবের জন্য সম্পাদিত।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে সরাসরি উত্তর দেওয়ার সংস্কৃতি এখনও বিরল। ক্ষমতাসীনদের অনেকে প্রশ্ন এড়িয়ে যান, কেউ ব্যক্তিগত আক্রমণে নামেন, কেউ সরকারি পরিসংখ্যানের আড়ালে মানুষের অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করেন। নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী সাম্প্রতিক ‘ফ্যাক্ট চেক’ সাক্ষাৎকারে সেই পরিচিত পথে হাঁটেননি। রাজনৈতিক অবস্থান থেকে ব্যক্তিগত বিতর্ক—সবকিছু নিয়েই তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছে; তিনি উত্তর দিয়েছেন, নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন এবং আলোচনাকে শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবন ও জীবিকার প্রশ্নে ফিরিয়ে এনেছেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে তাঁর নাম ঘোষিত হওয়ার পর এই সাক্ষাৎকারের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। এখন তাঁর প্রতিটি বক্তব্য একজন বিরোধী নেতার মন্তব্যের পাশাপাশি রাজধানীর সম্ভাব্য নগর নেতৃত্বের রাজনৈতিক পরীক্ষাও। সেই পরীক্ষায় সাক্ষাৎকারটির মূল বার্তা পরিষ্কার: একটি সরকার সফল কি না, তার প্রমাণ বক্তৃতায় নয়—মানুষের পকেট, বাজার, কর্মস্থল এবং কৃষকের জমিতে।

বিচ্ছিন্ন বিতর্ক দিয়ে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্ন চাপা পড়বে না

আসিফ নজরুলকে ঘিরে আলোচিত ছাগলের ঘটনার সঙ্গে নিজের সরাসরি সম্পৃক্ততা নাসীরুদ্দীন স্পষ্টভাবে অস্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বলেছেন, কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি অনুমতি ছাড়া নেওয়াকে তিনি সমর্থন করেন না। ‘দুইটাই খাওয়া উচিত ছিল’ মন্তব্যটি আক্ষরিক অর্থে সম্পত্তি দখল বা পশু হত্যার সমর্থন নয়; গণঅভ্যুত্থানের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক ক্ষোভের ভাষা—সাক্ষাৎকারে তিনি সেই প্রেক্ষাপটই ব্যাখ্যা করেছেন।

বিতর্কিত বাক্যটি নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু তার আড়ালে বড় প্রশ্নগুলো হারিয়ে যেতে পারে না। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল, সেটি কেন পুরোনো সাংবিধানিক বন্দোবস্তের মধ্যে আটকে গেল? গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও নিয়োগে দলীয় প্রভাবের অভিযোগ কেন ফিরল? আন্দোলনের পক্ষের মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো কেন বাস্তবায়িত হলো না? নাসীরুদ্দীনের ক্ষোভের রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল এখানেই।

অভিযোগের জবাব প্রমাণে—শিরোনামের অঙ্কে নয়

এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিদেশে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের একটি অভিযোগ দুদকের চলমান অনুসন্ধানে যুক্ত হয়েছে। নাসীরুদ্দীন অভিযোগটিকে বিনা প্রশ্নে প্রত্যাখ্যানও করেননি, আবার প্রমাণের আগে সত্য হিসেবেও মেনে নেননি। তিনি যথার্থভাবেই জানতে চেয়েছেন—টাকার উৎস কোথায়, কোন দেশে স্থানান্তরের ব্যাংক নথি আছে, তথ্যের উৎস কী এবং অভিযোগের পক্ষে যাচাইযোগ্য প্রমাণ কোথায়?

পরবর্তী ফ্যাক্টচেকিং প্রতিবেদনে অভিযোগটির উৎস ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। একই দেশের নাম ও একই অর্থের অঙ্ক আগে একটি প্রমাণহীন প্রচারণামূলক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছিল বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে স্বাধীন অনুসন্ধান জরুরি, কিন্তু দুদককেও ব্যাখ্যা করতে হবে—কীভাবে অভিযোগটি তৈরি হলো এবং তার প্রাথমিক প্রমাণ কী। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক চরিত্রহননের অস্ত্র হতে দেওয়া যায় না। অভিযোগ সত্য হলে প্রমাণসহ ব্যবস্থা হোক; ভিত্তিহীন হলে অপপ্রচারের উৎসও প্রকাশ হোক।

প্রমাণহীন ব্যক্তিগত আক্রমণের জবাব ছিল সরাসরি

রাশেদ খানের করা মাদক সেবনের অভিযোগ নাসীরুদ্দীন সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তিনি পাল্টা কোনো প্রমাণহীন অভিযোগ করেননি; কেন এমন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে অনুমান না করে অভিযোগকারীকেই প্রমাণ দেওয়ার দায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। একটি অপপ্রচারের জবাবে আরেকটি অপপ্রচার তৈরি না করা দায়িত্বশীল রাজনীতির পরিচয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে প্রমাণ থাকলে তা প্রকাশ করা উচিত; প্রমাণ না থাকলে চরিত্রহননের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে।

সরকারের আসল মূল্যায়ন মানুষের পকেটে

সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রশ্ন ছিল—সাধারণ মানুষের পকেটে টাকা আছে কি না। আগস্টে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২৬ শতাংশ, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯.৩২ শতাংশ এবং জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ৮.০৫ শতাংশ। অর্থাৎ আয়ের গতি জীবনযাত্রার ব্যয়ের পেছনে। এই ব্যবধানই বলে দেয় কেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ প্রতিদিন বাজারে আরও বেশি চাপ অনুভব করছেন।

এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিলে সরকারকে মাসওয়ারি হিসাব দিতে হবে—কতটি নতুন কাজ তৈরি হয়েছে, কতজন শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন, কতটি কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং তরুণদের জন্য ঘোষিত কর্মসূচিতে বাস্তবে কতজন স্থায়ী ও সম্মানজনক কাজ পেয়েছেন। বড় প্রতিশ্রুতি দিয়ে উল্টো চাকরি কমলে নেতৃত্বকে প্রশ্ন করা বিরোধী রাজনীতির দায়িত্ব। বক্তৃতা দিয়ে বেকার তরুণের জীবন চলে না।

গুদামে সার থাকলেই কৃষকের সংকট শেষ হয় না

সরকার বলছে দেশে সারের সামগ্রিক ঘাটতি নেই। অথচ বিভিন্ন জেলার কৃষকেরা নির্ধারিত দামে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার কথা বলছেন; কোথাও অনুমোদিত ডিলারের কাছে সার নেই, কোথাও খোলাবাজারে প্রতি ৫০ কেজির বস্তায় ৩০০–৩৫০ টাকা পর্যন্ত বেশি দিতে হচ্ছে। কাগজে মজুত থাকা আর সঠিক সময়ে কৃষকের হাতে সার পৌঁছানো এক বিষয় নয়। সরবরাহব্যবস্থা ব্যর্থ হলে গুদামের হিসাব কৃষকের ফসল বাঁচায় না।

‘কাগুজে বাঘ’—ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নয়, ফলাফলের রাজনৈতিক পরীক্ষা

তারেক রহমানকে ‘কাগুজে বাঘ’ বলার ব্যাখ্যায় নাসীরুদ্দীন বলেছেন, এটি ব্যক্তিগত বিরোধ নয়; প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধানের রাজনৈতিক মূল্যায়ন। একজন নেতার শক্তি বোঝা যায় তাঁর সরকারের কাজে—মানুষের আয় বাড়ছে কি না, কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে কি না, কৃষক উৎপাদনের উপকরণ পাচ্ছেন কি না এবং নাগরিক নিরাপদ কি না। এসব ক্ষেত্রে ফল না থাকলে শক্তিশালী ভাষণ আর ক্ষমতার প্রদর্শন দিয়ে ব্যর্থতা ঢেকে রাখা যায় না।

পররাষ্ট্রনীতিতে দেশের স্বার্থ কোথায়—জনগণকে জানাতে হবে

‘দেশকে একশ জায়গায় বিক্রি করা হচ্ছে’—নাসীরুদ্দীনের ভাষা তীব্র, কিন্তু এর ভেতরের প্রশ্ন জরুরি। একই প্রকল্প নিয়ে কখনো চীন, কখনো ভারত, কখনো যুক্তরাষ্ট্রকে ভিন্ন বার্তা দিলে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশল কী? কোন সিদ্ধান্তে দেশের কী লাভ, কী দায় তৈরি হবে এবং চুক্তির শর্ত জনগণ জানবে কি না? সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক দরকার, কিন্তু কোনো দেশের অধীনতা মেনে নয়। রাষ্ট্রের সম্পদ ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত কোনো সরকারের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।

গাড়ির বিতর্কে অনুমান নয়, তথ্যই শেষ কথা

লং মার্চে ব্যবহৃত ছাদখোলা গাড়িটি নিজের নয় বলে নাসীরুদ্দীন জানিয়েছেন। একটি কর্মসূচির জন্য বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের মাধ্যমে সেটির ব্যবস্থা হয়েছিল। গাড়ি উপহার নেওয়া বা বিনিময়ে কাউকে রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার কোনো প্রমাণ সামনে আসেনি। তাই অনুমানকে সত্য বানিয়ে প্রচার করা গ্রহণযোগ্য নয়। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, মানুষ এনসিপির নেতাদের সাধারণ মানুষের মধ্য থেকে উঠে আসা প্রতিনিধি হিসেবে দেখে; সেই প্রত্যাশা মাথায় রেখে ভবিষ্যতে আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

ঢাকা-৮ আসনে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর সমর্থনে নির্বাচনী মিছিলে শাপলা কলি প্রতীক হাতে মানুষ
মানুষের ভেতর থেকে উঠে আসা রাজনীতির শক্তি মানুষের আস্থাতেই। সেই আস্থা রক্ষার পথ হলো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং প্রতিশ্রুতিকে কাজে প্রমাণ করা। · ছবির উৎস

প্রশ্নের ঊর্ধ্বে কেউ নয়—এটাই জুলাইয়ের রাজনীতি

সাক্ষাৎকারের শেষ বক্তব্যটিই নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর রাজনৈতিক অবস্থানের সারাংশ: কোনো ব্যক্তি, দল বা প্রতিষ্ঠান জনগণের প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। বর্তমান সরকারকে কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, কৃষি, আইনশৃঙ্খলা ও পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে জবাব দিতে হবে। এনসিপিও নিজের নেতা, সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক আচরণ নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেবে। পুরোনো দলগুলো প্রশ্নকে শত্রুতা এবং সমালোচনাকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেছে; জুলাইয়ের রাজনীতি প্রশ্নকে ভয় পাবে না, উত্তর ও আত্মসংশোধনের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করবে।

ছাগল কিংবা গাড়ির আলোচনা সামাজিক মাধ্যমে বেশি ছড়াতে পারে। কিন্তু সাক্ষাৎকারটির আসল রাজনৈতিক বার্তা আরও গভীর: সরকারের সাফল্য বক্তৃতায় নয়—মানুষের পকেটে, কৃষকের জমিতে, শ্রমিকের কর্মস্থলে এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌম সিদ্ধান্তে প্রমাণ করতে হয়। নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী কঠিন প্রশ্ন এড়িয়ে যাননি; অভিযোগকে প্রমাণ ছাড়া সত্য মানেননি এবং সরকারের মূল্যায়নকে মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। বর্তমান সরকার সেই পরীক্ষায় কোথায় দাঁড়িয়ে আছে—এখন সেই হিসাব দেওয়ার সময়।

তথ্যসূত্র

  1. সমকাল: ঢাকা উত্তরে এনসিপির প্রার্থী আসিফ, দক্ষিণে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী
  2. ইত্তেফাক: আসিফ নজরুলের ছাগল নিয়ে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর বক্তব্য
  3. বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর: আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক
  4. দ্য ডেল্টা লেন্স: দুদকে জমা অভিযোগের উৎস নিয়ে দ্য ডিসেন্ট ও রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক
  5. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: আগস্টে মূল্যস্ফীতি ৮.২৬ শতাংশ
  6. দ্য ডেইলি স্টার: মজুত থাকা সত্ত্বেও কৃষকের কাছে সার পৌঁছানোর সংকট
  7. জাগো নিউজ: ছাদখোলা গাড়িতে লংমার্চে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী
  8. Wikimedia Commons: নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর CC BY-SA 4.0 প্রতিকৃতি
  9. Wikimedia Commons: নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর নির্বাচনী মিছিলের CC BY-SA 4.0 ছবি