একটি হাজিরা খাতার চেয়ে বড় প্রশ্ন
৩১ আগস্ট সকালে নারায়ণগঞ্জের একই কম্পাউন্ডে থাকা তিনটি ভূমি অফিসে কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতির মধ্যে হাজিরা খাতায় আগাম স্বাক্ষরের অভিযোগ ওঠে। পরে শোকজ জারির খবরও আসে। ঘটনাটি এখনো তদন্তাধীন; কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর দায় প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু অভিযোগটি সত্য না মিথ্যা—তার দ্রুত, নথিভিত্তিক ও প্রকাশ্য নিষ্পত্তি না হলে সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হবে সেই নাগরিকের, যিনি নামজারি, খাজনা, রেকর্ড বা অন্য ভূমিসেবার জন্য নির্ধারিত সময়ে অফিসে যান।
এখানে প্রশ্ন শুধু কেউ দেরিতে এলেন কি না, সেটি নয়। সরকারি কর্মচারীর উপস্থিতির নিয়ম আছে, অফিসে সেবা দেওয়ার দায় আছে, আর অভিযোগ উঠলে সঠিক তথ্য জানার নাগরিকের অধিকারও আছে। এক দিনের আকস্মিক পরিদর্শন প্রশাসনিক সতর্কতা তৈরি করতে পারে। কিন্তু ফলাফল গোপন থাকলে সেটি জবাবদিহি নয়; সেটি কেবল একটি মুহূর্তের দৃশ্য হয়ে থাকে।
কী জানা গেছে, কী এখনো জানা যায়নি
দ্য ডেইলি স্টারের ৩১ আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন সকালে খানপুরে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা ভূমি অফিস এবং ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ রাজস্ব সার্কেলের অফিস পরিদর্শন করেন। প্রতিবেদনে তাঁর উদ্ধৃতিতে বলা হয়, কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী সকাল ৯টার পরও অনুপস্থিত ছিলেন; তাঁদের কারও কারও নামে সেদিনের হাজিরা আগেই দেওয়া ছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি তদন্ত এবং আগের সাত দিনের সিসিটিভি ফুটেজ চেয়েছেন বলেও পত্রিকাটি জানিয়েছে।
একই দিনের পরে প্রকাশিত দ্য ডেইলি স্টারের আরেক প্রতিবেদনে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখার এক কর্মকর্তার উদ্ধৃতিতে বলা হয়, দুই সহকারী কমিশনার (ভূমি)সহ ২০ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে এবং তিন কর্মদিবসের মধ্যে জবাব চাইতে বলা হয়েছে। জাগোনিউজের প্রতিবেদনে জেলা প্রশাসকের উদ্ধৃতিতে সংখ্যাটি ১৮। এই পার্থক্য ছোট বিষয় নয়। প্রকাশ্য নোটিশ বা যাচাইকৃত তালিকা ছাড়া আমরা ১৮ বা ২০—কোনো সংখ্যাকেই চূড়ান্ত সত্য বলছি না। এই লেখায় নিশ্চিতভাবে বলা যায় শুধু এতটুকু: সংবাদমাধ্যমগুলো প্রশাসনিক শোকজের কথা জানিয়েছে; কতজন এবং কার বিরুদ্ধে কী নির্দিষ্ট অভিযোগ, তার একক সরকারি তালিকা আমরা খুঁজে পাইনি।
তদন্তের আগে আরও কিছু সতর্কতা জরুরি। প্রথম পরিদর্শন-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, একজন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাতৃত্বকালীন ছুটিতে এবং আরেকজন উপজেলা পরিষদে সরকারি কর্মসূচিতে ছিলেন; অন্যদের অনুপস্থিতি যাচাই করা হবে। অর্থাৎ একই কম্পাউন্ডে থাকা সব ব্যক্তির অবস্থাকে এক কথায় ‘ফাঁকি’ বলা ন্যায্য হবে না। উপস্থিতির খাতা, ছুটির অনুমোদন, দায়িত্বপালনের আদেশ, সিসিটিভির সময়চিহ্ন এবং প্রত্যেকের লিখিত ব্যাখ্যা মিলিয়েই সিদ্ধান্ত হতে হবে।
নিয়মটি নতুন নয়, তাই পরীক্ষাটিও কঠিন
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯ অনুযায়ী পূর্বানুমতি ছাড়া কর্মে অনুপস্থিত থাকা যায় না; বিধিমালার অধীনে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে অনুপস্থিতির প্রতিদিনের জন্য এক দিনের মূল বেতন পর্যন্ত কর্তনের বিধান আছে। ২৪ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগও সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত সময়ে উপস্থিতি ও প্রস্থানের বাধ্যবাধকতার কথা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেয়। ফলে ৩১ আগস্টের ঘটনা কোনো অজানা নিয়ম ভাঙার অভিযোগ নয়; প্রশ্ন হলো, দীর্ঘদিনের নিয়মটি মাঠপর্যায়ে কীভাবে পর্যবেক্ষিত হচ্ছে।
হিসাবটি পাশাপাশি রাখি। নিয়মে উপস্থিতির দায়, মন্ত্রিপরিষদের স্মরণপত্রে সব প্রতিষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা, আর স্থানীয় পরিদর্শনে অনুপস্থিতি ও আগাম স্বাক্ষরের অভিযোগ—এই তিনটি তথ্য একসঙ্গে একটি ব্যবস্থাপনাগত ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। তবে একটি অফিসের ঘটনা দিয়ে সারা দেশের ভূমি প্রশাসন সম্পর্কে রায় দেওয়া যাবে না। জাতীয় প্রবণতা বলতে হলে অফিসভিত্তিক উপস্থিতি, অভিযোগ, নামজারি ও রেকর্ডসেবার সময়, শাস্তিমূলক পদক্ষেপ এবং আপিলের তুলনাযোগ্য তথ্য লাগবে। সেই ড্যাশবোর্ড এখনো জনসমক্ষে নেই।
আগের সতর্কতা থেকে কী শেখা হলো?
নারায়ণগঞ্জেই এ বছরের মার্চে আরেক আকস্মিক পরিদর্শনে একটি ভূমি অফিসে কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। দ্য ডেইলি স্টারের ৫ মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখনও এক প্রতিমন্ত্রী সকাল ৯টার দিকে গিয়ে অফিসকক্ষ বন্ধ এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনুপস্থিত দেখতে পান; মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পরে উপস্থিতির সময় মানার নির্দেশনার কথাও জানিয়েছিল। মার্চের ঘটনাটি এবং ৩১ আগস্টের ঘটনা একই ব্যক্তি বা একই প্রশাসনিক বাস্তবতার প্রমাণ নয়। কিন্তু একই জেলায় কয়েক মাসের ব্যবধানে একই ধরনের অভিযোগ সামনে এলে স্বাভাবিক প্রশ্ন ওঠে: আগের নির্দেশনা, তদারকি এবং সংশোধনী ব্যবস্থা কী ফল দিয়েছিল?
এখানেই সমস্যাটি। অভিযানের ছবি বা তিরস্কারের ভাষা সহজে ছড়ায়, কিন্তু পরে কে জবাব দিলেন, কোন ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হলো, কোনো অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হলো কি না, কার বিরুদ্ধে কী অনুপাতিক ব্যবস্থা হলো—এসব তথ্য না এলে শেখার সুযোগ তৈরি হয় না। আবার তদন্ত অসমাপ্ত রেখে নাম ও অভিযোগ ছড়ালে ন্যায্য প্রক্রিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জবাবদিহির দুই দিকই তাই একসঙ্গে রক্ষা করতে হবে: সেবাগ্রহীতার প্রতি কঠোরতা এবং অভিযুক্ত কর্মীর প্রতি প্রমাণভিত্তিক ন্যায্যতা।
সরকারের অবস্থান: ব্যবস্থা হবে, কিন্তু প্রমাণ দরকার
সরকারের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানটি এই: প্রতিমন্ত্রী তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন; জেলা প্রশাসন কারণ দর্শাতে বলেছে; এরপর লিখিত জবাব বিবেচনা করেই ব্যবস্থা হবে। এটি আইনসম্মত ও সংযত পথ। তাৎক্ষণিক শাস্তি দিয়ে কোনো কর্মীর ছুটি, সরকারি দায়িত্ব বা ব্যাখ্যাকে অগ্রাহ্য করা উচিত নয়। প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যেও কেবল শাস্তি নয়, সেবার মানসিকতা বদলের কথা এসেছে।
কিন্তু সরকারের এই যুক্তির বাস্তব পরীক্ষা হবে পরের ধাপে। সাত দিনের সিসিটিভি ফুটেজ যদি চাওয়া হয়ে থাকে, সেটি সংরক্ষিত ও পর্যালোচিত হয়েছে কি না; হাজিরা খাতার সঙ্গে অনুমোদিত ছুটি বা দায়িত্বের নথি মেলানো হয়েছে কি না; অভিযোগে সেবাগ্রহীতার অপেক্ষা বা ফাইল-নিষ্পত্তিতে কতটা প্রভাব পড়েছে; এবং শোকজের ফল কী—এসবের একটি সংক্ষিপ্ত, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা সারাংশ প্রকাশ করা সম্ভব। তদন্তের বিস্তারিত গোপনীয় হতে পারে, কিন্তু জবাবদিহির ফল সম্পূর্ণ অদৃশ্য হতে পারে না।
নথি খোলা থাকলে আস্থা বাড়ে কেন
প্রথম লাভটি হলো ভুল ও দায়ের পার্থক্য করা যায়। সকাল ৯টায় কোনো কর্মকর্তা কক্ষে নেই—এ তথ্য নিজে নিজে সব ব্যাখ্যা দেয় না। তিনি অনুমোদিত ছুটিতে থাকতে পারেন, মাঠপর্যায়ের দায়িত্বে থাকতে পারেন, অন্য সরকারি কর্মসূচিতে থাকতে পারেন, অথবা বিনা অনুমতিতে অনুপস্থিতও থাকতে পারেন। একটি সঠিক তদন্তে এই সম্ভাবনাগুলোকে খোলা মনে যাচাই করতে হয়। তাই প্রকাশ্য ফলাফলে ব্যক্তিগত ফাইল বা সংবেদনশীল তথ্য দেওয়ার প্রয়োজন নেই; অফিসভিত্তিক কতটি অভিযোগ যাচাই হলো, কতটি ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হলো এবং কতটির ক্ষেত্রে ব্যবস্থা হলো—এই সারাংশই যথেষ্ট শুরু।
দ্বিতীয় লাভটি হলো সেবার সঙ্গে উপস্থিতির সম্পর্ক দেখা যায়। ভূমি অফিসে শুধু উপস্থিতি মেপে সফলতা ঘোষণা করলে হবে না। সেদিন কতজন সেবাগ্রহীতা ফিরে গেছেন, কতটি নামজারি আবেদন গ্রহণ বা নিষ্পত্তি হয়েছে, কতটি খাজনা বা রেকর্ডসংক্রান্ত অনুসন্ধানের উত্তর পাওয়া গেছে, এবং কতটি অভিযোগ এসেছে—এমন কয়েকটি সাধারণ সূচক মাসভিত্তিক দিলে নাগরিক বুঝতে পারবেন শৃঙ্খলার উন্নতি আসলে কাজে লেগেছে কি না। উপস্থিতি হলো উপায়; সময়মতো, ন্যায্য ও পূর্বানুমানযোগ্য সেবা হলো লক্ষ্য।
তৃতীয় লাভটি হলো একই ভুল বারবার ঘটলে তার প্রশাসনিক কারণ ধরা পড়ে। কোথাও জনবল কম, কোথাও দায়িত্ব বণ্টন অস্পষ্ট, কোথাও ছুটি ও মাঠদায়িত্বের তালিকা কাউন্টারে নেই, আবার কোথাও তদারকি কেবল আকস্মিক অভিযাননির্ভর—প্রতিটি সমস্যার সমাধান আলাদা। সব ব্যর্থতাকে ব্যক্তিগত অসদাচরণ বললে ব্যবস্থার ত্রুটি চাপা পড়ে। আবার সবকিছুকে ‘সিস্টেমের সমস্যা’ বললে ব্যক্তিগত দায়ও ঝাপসা হয়। তথ্য প্রকাশের কাজটি এই দুই অতি সরল ব্যাখ্যা থেকে প্রশাসনকে দূরে রাখে।
এখানে প্রযুক্তি নিয়ে সংযমও দরকার। সিসিটিভি, ডিজিটাল উপস্থিতি বা অনলাইন ফাইল-ট্র্যাকিং সহায়ক হতে পারে, কিন্তু এগুলো নিজেরাই সুশাসনের প্রমাণ নয়। যন্ত্রের সময়চিহ্ন ভুল হতে পারে, ক্যামেরা অচল থাকতে পারে, বৈধ মাঠদায়িত্ব নথিভুক্ত না-ও থাকতে পারে। অন্যদিকে কেবল কাগুজে হাজিরা খাতা সহজে যাচাই করা কঠিন। কাজেই প্রযুক্তি ব্যবহার হলে তার তথ্য কে দেখবে, কতদিন সংরক্ষণ হবে, ভুল হলে কীভাবে সংশোধন হবে এবং নাগরিক কোন সমষ্টিগত ফল দেখতে পাবেন—এই ন্যূনতম নিয়ম আগে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
এই মানদণ্ডটি কোনো এক দল, মন্ত্রী বা কর্মকর্তার জন্য আলাদা হতে পারে না। বর্তমান সরকার নিজেই নিয়মিত উপস্থিতির কথা স্মরণ করিয়েছে; তাই সেই প্রতিশ্রুতি মাপার দায়িত্বও তার। বিরোধী দলের অভিযোগ বা সমর্থন এখানে প্রমাণের বিকল্প নয়। এই চক্রে এনসিপির কোনো নির্দিষ্ট দাবি ব্যবহার করা হয়নি, কারণ খোলা চ্যানেলে এমন কোনো সংশ্লিষ্ট দাবি পাওয়া যায়নি যার প্রতিটি উপাদান স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব। আমাদের অবস্থান তাই দলীয় বক্তব্য নয়, সরকারি বিধি ও প্রকাশিত প্রতিবেদনের সীমার মধ্যে রাখা হয়েছে।
ভূমি মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোর জন্য এখন একটি বাস্তব সুযোগ আছে। তাঁরা চাইলে তিন অফিসের জন্য একটি সংক্ষিপ্ত ফল-নোট প্রকাশ করতে পারেন: পরিদর্শনের সময়, পর্যালোচিত নথির ধরন, কতটি ব্যাখ্যা পাওয়া গেল, কতটি গ্রহণ করা হলো, কী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হলো এবং সেবা চালু রাখতে কী বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এতে তদন্ত প্রভাবিত হবে না; বরং গুজবের জায়গা কমবে। যারা নির্দোষ, তাঁদের ক্ষেত্রেও নথিভিত্তিক দায়মুক্তি গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে, নাগরিকের কাছে প্রশাসনের ন্যূনতম প্রতিশ্রুতি হওয়া উচিত সহজ: অফিসে গিয়ে তিনি কাউকে পাবেন, না পেলে কেন পাবেন না তা আগে থেকে জানবেন, আর অনিয়মের অভিযোগ করলে তার পরিণতি জানতে পারবেন। এই তিনটি প্রতিশ্রুতি পূরণে বড় প্রকল্পের দরকার নেই; দরকার দায়িত্বের রেকর্ড, নির্দিষ্ট সময়সীমা এবং ফল প্রকাশের অভ্যাস। নারায়ণগঞ্জের ঘটনাটি সেই অভ্যাস গড়ার একটি পরীক্ষার সুযোগ।
যে সাতটি উত্তর নাগরিকের প্রাপ্য
- জেলা প্রশাসন কি শোকজপ্রাপ্তের চূড়ান্ত সংখ্যা, পদ ও অফিসভিত্তিক একটি যাচাইকৃত তালিকা প্রকাশ করবে?
- ১৮ ও ২০ সংখ্যার ভিন্নতার কারণ কী, এবং কোন নথি সেটি মীমাংসা করে?
- সিসিটিভি ফুটেজ, হাজিরা খাতা, অনুমোদিত ছুটি ও সরকারি দায়িত্বের নথি কীভাবে মিলিয়ে দেখা হয়েছে?
- কোন কোন অভিযোগ তদন্তে সত্য, আংশিক সত্য বা অসত্য পাওয়া গেল—তার সংক্ষিপ্ত ফল কি জানানো হবে?
- সেবাগ্রহীতার নামজারি, খাজনা, রেকর্ড বা অন্যান্য আবেদনে সেদিন ও আগের সপ্তাহে কোনো বিলম্ব হয়েছে কি না, তার তথ্য কি প্রকাশ পাবে?
- মার্চের পরিদর্শনের পর কী সংশোধনী পদক্ষেপ হয়েছিল, এবং এবার তার কোন অংশ ব্যর্থ বা অসম্পূর্ণ রইল?
- নিয়মিত উপস্থিতি ও সেবা-নিষ্পত্তির মাসিক অফিসভিত্তিক সূচক প্রকাশের পরিকল্পনা কি ভূমি মন্ত্রণালয় করবে?
এক দিনের অভিযানকে স্থায়ী সেবায় রূপ দিন
ভূমি অফিসে নাগরিক কেবল একটি কাগজের জন্য যান না। সেখানে উত্তরাধিকার, ছোট জমির নিরাপত্তা, ঋণ, ঘর নির্মাণ, কৃষি কিংবা বহু বছরের পারিবারিক বিরোধের সমাধান জড়িয়ে থাকতে পারে। নির্ধারিত সময়ে কর্মকর্তা না থাকলে ক্ষতিটি সবচেয়ে বেশি বহন করেন সেই মানুষ, যাঁর পক্ষে বারবার অফিসে যাওয়া ব্যয়বহুল। তাই নিয়মিত উপস্থিতি কোনো দাপ্তরিক সৌজন্য নয়; এটি সেবার ন্যূনতম শর্ত।
আমাদের বিবেচনায়, নারায়ণগঞ্জের ঘটনায় এখন প্রয়োজন তিনটি সীমিত কিন্তু মাপা পদক্ষেপ: তিন কর্মদিবসের জবাবের পর নির্দিষ্ট সময়সীমায় ফলের সারাংশ; সিসিটিভি ও নথি যাচাইয়ের স্বাধীন প্রশাসনিক রেকর্ড; এবং পরবর্তী তিন মাসে ওই তিন অফিসের উপস্থিতি ও সেবা-নিষ্পত্তির মাসিক প্রকাশনা। এতে কাউকে আগাম দোষী বলা হবে না, আবার নাগরিককেও অন্ধভাবে আশ্বাসে থাকতে হবে না। নিয়মের মর্যাদা তখনই বাড়ে, যখন তার প্রয়োগ দেখা যায় এবং ভুল হলে তার সংশোধনও দেখা যায়।
শোকজের চিঠি দিয়ে গল্প শেষ করা সহজ। কিন্তু এই ঘটনার প্রকৃত পরীক্ষা হবে পরে: সরকার কি প্রমাণ মেলাবে, নির্দোষকে দায়মুক্ত করবে, দায় থাকলে অনুপাতিক ব্যবস্থা নেবে, এবং নাগরিককে জানাবে সেবাটি আগের চেয়ে সময়মতো মিলছে কি না? সেই প্রকাশ্য উত্তরই নির্ধারণ করবে ৩১ আগস্টের পরিদর্শনটি একটি ক্ষণিকের সতর্কতা, নাকি ভূমিসেবায় জবাবদিহির বাস্তব শুরু।
তথ্যসূত্র
- জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়: সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯ (প্রকাশিত ৫ ডিসেম্বর ২০১৯)
- মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ: নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিতি ও প্রস্থান বিষয়ে স্মারক (২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)
- দ্য ডেইলি স্টার: নারায়ণগঞ্জে অনুপস্থিতি ও আগাম হাজিরার অভিযোগে প্রতিমন্ত্রীর তদন্ত নির্দেশ (৩১ আগস্ট ২০২৬)
- দ্য ডেইলি স্টার: ২০ জনকে শোকজের প্রতিবেদন ও প্রশাসনের বক্তব্য (৩১ আগস্ট ২০২৬)
- জাগোনিউজ২৪: ১৮ জনকে শোকজের প্রতিবেদন ও জেলা প্রশাসকের বক্তব্য (৩১ আগস্ট ২০২৬)
- দ্য ডেইলি স্টার: মার্চের নারায়ণগঞ্জ ভূমি অফিস পরিদর্শন ও উপস্থিতি নির্দেশনা (৫ মার্চ ২০২৬)
