NCP Diaspora Alliance GermanyNCP Diaspora Alliance Germanyমূল ওয়েবসাইট →

জ্বালানি জবাবদিহি

সরকারি ছাদে সৌরবিদ্যুৎ: খরচ, মডেল ও ফলের হিসাব আগে প্রকাশ হোক

সম্পাদকীয় ডেস্ক · ২৬ আগস্ট ২০২৬

স্থানীয় সরকার দপ্তরের ছাদে ধাপে ধাপে সৌরবিদ্যুতের পরিকল্পনা আশাব্যঞ্জক। কিন্তু খরচ, অর্থায়ন, ক্রয়-পদ্ধতি, গ্রিড সক্ষমতা ও উৎপাদনের হিসাব প্রকাশ ছাড়া এর সাশ্রয়ের দাবি যাচাই করা যাবে না।

জনস্বার্থ, নথি ও জবাবদিহির প্রতীকী সম্পাদকীয় চিত্র

NCP Diaspora Alliance Germany-এর সম্পাদনা–বিশ্লেষণ চিত্র; এটি কোনো বাস্তব ঘটনার ছবি নয়।

স্থানীয় সরকার বিভাগের এবং পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের অধীন সব সরকারি দপ্তরভবনের ছাদে ধাপে ধাপে সৌর প্যানেল বসানোর উদ্যোগের কথা ২৫ আগস্ট জানানো হয়েছে। ব্যয় কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো এবং উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দেওয়ার সম্ভাবনা—উদ্দেশ্যগুলো যুক্তিসংগত। কিন্তু যে পরিকল্পনায় বহু সরকারি ভবন, সম্ভাব্য সরকারি অর্থ ও বেসরকারি সহযোগিতা জড়াতে পারে, তার প্রথম পরীক্ষা হবে খোলা হিসাব।

এখনো এটি অনুমোদিত প্রকল্প, বাজেট বরাদ্দ বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি নয়। বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ আগস্ট মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশের ধারাবাহিকতায় ১৭ আগস্টের সিদ্ধান্তের পর দুটি কমিটি ছাদের এলাকা, সম্ভাব্য খরচ ও চ্যালেঞ্জ দেখেছে। কিন্তু প্রকাশ্য বিবৃতিতে কতটি ভবন, কত মেগাওয়াট, মোট ব্যয়, অর্থের উৎস, সময়সীমা বা বাছাইয়ের মানদণ্ড নেই। তাই প্রশ্নটি সৌরবিদ্যুতের পক্ষে না বিপক্ষে নয়; জনগণের অর্থে নকশাটি কি যাচাইযোগ্য হবে?

পরিকল্পনা আছে, কিন্তু জনসমক্ষে পরিমাপ নেই

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেছেন, নেট মিটারিং ও হাইব্রিড ব্যবস্থা বিবেচনায় আছে; প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা এবং বেসরকারি খাতের কারিগরি দক্ষতা ব্যবহারের কথাও বলা হয়েছে। ওয়ালটন, প্রাণ-আরএফএল ও গ্রামীণ শক্তির মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কারিগরি সহায়তা বা সমঝোতা স্মারকের উদ্যোগের কথাও প্রতিবেদনে আছে। এটি চুক্তি বা সুবিধা দেওয়ার প্রমাণ নয়। বরং এতেই প্রয়োজনটি স্পষ্ট: কোন ভবনে কোন মডেল, কোন প্রতিষ্ঠানের কী ভূমিকা, এবং কোনো ব্যয় বা ঝুঁকি রাষ্ট্র নেবে—এসব আগে নথিতে আসা দরকার।

সরকারের পক্ষে শক্ত যুক্তি আছে। ছাদ ব্যবহার করলে নতুন জমি লাগে না; স্থানীয় দপ্তরের নিজের দিনের বিদ্যুৎ ব্যবহার কমতে পারে; উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে গ্রিডে যেতে পারে। স্রেডার তথ্যেও দেখা যায়, দেশে নেট-মিটারযুক্ত রুফটপ ব্যবস্থা ইতিমধ্যে বিস্তৃত হচ্ছে। অর্থাৎ উদ্যোগটি শূন্য থেকে শুরু হচ্ছে না। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে ব্যয়, উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণের বাস্তব মানদণ্ড প্রকাশ না করলে পুরোনো সক্ষমতাকে নতুন প্রকল্পের সাশ্রয়ের নিশ্চয়তা বলা যাবে না।

মডেল বাছাই মানেই কার অর্থ, কার ঝুঁকি

বিদ্যুৎ বিভাগের নেট মিটারিং নির্দেশিকা–২০২৫ নিজ অর্থায়নের CAPEX এবং তৃতীয় পক্ষের OPEX—দুই পথই রেখেছে। CAPEX-এ সরকারি দপ্তর শুরুতে প্যানেল, ইনভার্টার ও অন্যান্য সরঞ্জামের খরচ বহন করবে; OPEX-এ অন্য বিনিয়োগকারী ব্যবস্থা বসিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ নির্ধারিত দরে বিক্রি করতে পারে। নির্দেশিকায় OPEX ক্ষেত্রে প্রযোজ্য দরপত্র বা আলোচনা শেষে চুক্তির কথা আছে। ফলে ‘সৌর প্যানেল বসবে’ এক বাক্যের আড়ালে মূল প্রশ্নটি থেকে যায়: রাষ্ট্র এককালীন খরচ নেবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি প্রতি-ইউনিট দামে কিনবে?

দুই মডেলের কোনোটিই নিজে খারাপ নয়। কিন্তু তুলনাটি না জানলে কম খরচের দাবি পরীক্ষা করা যায় না। প্রতি ভবনের প্রস্তাবিত ক্ষমতা, মূলধনী ব্যয় বা OPEX দর, চুক্তির মেয়াদ, রক্ষণাবেক্ষণ কার, গ্রিড-সংযোগে কী কাজ লাগবে এবং ব্যর্থ উৎপাদনের দায় কার—এই তথ্য ছাড়া সরকারি অফিসের বিদ্যুৎ বিল কমল কি না, নাকি খরচ অন্য খাতে সরে গেল, তা বোঝা অসম্ভব।

মিটার বসালেই জবাবদিহি সম্পূর্ণ হয় না

নেট মিটারিং নির্দেশিকায় উৎপাদন ও গ্রিডে রপ্তানির হিসাব আলাদা মিটারে রাখার এবং স্থাপিত ব্যবস্থার তথ্য জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ডেটাবেইজে দেওয়ার ব্যবস্থা আছে। এই অবকাঠামোটি সরকারের জন্য সুযোগ: শুধু প্যানেল বসানোর সংখ্যা নয়, প্রতিটি দপ্তরের স্থাপিত ক্ষমতা, মাসিক উৎপাদন, নিজস্ব ব্যবহার, গ্রিডে পাঠানো বিদ্যুৎ, বিল-সাশ্রয় ও বিকল থাকার সময়ের সমষ্টিগত তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা সম্ভব।

এখানে অতীত সরকারের দায় বা জ্বালানি খাতের পুরোনো সমস্যাকে নতুন সিদ্ধান্তের বিকল্প ব্যাখ্যা বানানো ঠিক হবে না। বর্তমান সরকারের সরাসরি দায় হলো এখন যে পরিকল্পনা শুরু করছে, তার বাছাই, ব্যয় ও ফল মাপার নিয়ম পরিষ্কার করা। ভালো ফল এলে সেই প্রকাশ্য তথ্যই সরকারের সাফল্যের সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ হবে; খারাপ ফল হলে একই তথ্য সংশোধনের পথ দেখাবে।

ঘোষণাকে পরীক্ষাযোগ্য কর্মসূচি করতে যা প্রকাশ দরকার

সৌরবিদ্যুতের আস্থা আসবে হিসাব থেকে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগের এই উদ্যোগ পরিবেশ ও সরকারি খরচ—দুই ক্ষেত্রেই সম্ভাবনা রাখে। প্রতিমন্ত্রীর ঘোষণাও অন্তত পরিকল্পনার প্রাথমিক ধাপটি প্রকাশ করেছে। এখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ সংস্থার করণীয় হলো পরবর্তী নথিগুলো গোপন না রাখা। কাজ শুরুর আগে তুলনামূলক হিসাব, কাজ চলাকালে ক্রয় ও চুক্তির তথ্য, আর কাজের পরে মিটারের ফল প্রকাশ করলে এটিই হবে প্রমাণ-ভিত্তিক সরকারি সাশ্রয়ের দৃষ্টান্ত।

তথ্যসূত্র

  1. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: ‘Solar panels to be installed on rooftops at all local government offices: Shahe Alam’—২৫ আগস্ট ২০২৬
  2. মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ: ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিগণ’—বর্তমান সরকার ও দপ্তর-দায়িত্বের সরকারি তালিকা
  3. বিদ্যুৎ বিভাগ: ‘জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি’—সরকারি বাস্তবায়ন-নথি ও নির্দেশিকার তালিকা
  4. বিদ্যুৎ বিভাগ: ‘নেট মিটারিং নির্দেশিকা–২০২৫’—CAPEX/OPEX, মিটারিং, চুক্তি ও ডেটা-নিবন্ধনের সরকারি নির্দেশিকা
  5. স্রেডা: ‘নেট মিটারিং রুফটপ সোলার প্রোগ্রাম’—ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সরকারি ব্যাখ্যা ও নেট মিটারিং প্রেক্ষাপট