১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর রায়টি কেবল সাতজন রাজনৈতিক নেতার শাস্তির সংবাদ নয়। এটি জুলাইয়ের সেই দিনগুলোর একটি বিচারিক স্বীকৃতি, যখন শান্তিপূর্ণ ছাত্র-জনতার ওপর সংগঠিত সহিংসতা চালিয়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ ওবায়দুল কাদের, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, মোহাম্মদ আলী আরাফাত, শেখ ফজলে শামস পরশ, মাইনুল হোসেন খান নিখিল, সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। সাতজনই পলাতক।
রায়ের আরেকটি অংশ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ওবায়দুল কাদেরসহ প্রথম পাঁচজনের সব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে বিক্রয়লব্ধ অর্থ জুলাইয়ে নিহত ও আহত ব্যক্তি বা তাঁদের পরিবারকে জুলাই ফাউন্ডেশন কিংবা অন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ হিসেবে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। অর্থাৎ বিচার প্রথমবারের মতো শাস্তির পাশাপাশি ভুক্তভোগীর আর্থিক অধিকারের প্রশ্নটিকেও সামনে এনেছে।
রায়ে যে দায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে
প্রকাশিত রায়ের বিবরণে ওবায়দুল কাদেরের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে নির্দেশ, উসকানি, ষড়যন্ত্র, সহায়তা এবং সহিংসতা প্রতিরোধে ব্যর্থতার দায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১১ জুলাই ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতিকে ফোনে আন্দোলনকারীদের মারার নির্দেশ, ১৫ জুলাই ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নামিয়ে দেওয়ার প্রকাশ্য বক্তব্য এবং ১৯ জুলাই ‘শুট অ্যাট সাইট’ ঘোষণার মতো ঘটনাগুলো বিচারিক বিবরণে এসেছে।
বাহাউদ্দিন নাছিমের বিরুদ্ধে হামলায় প্ররোচনা ও তদারকি; মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বিরুদ্ধে উসকানি, হামলার পরিকল্পনা এবং সংবাদ সম্প্রচার বন্ধে ভূমিকা; পরশ ও নিখিলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র দলীয় বাহিনীকে সক্রিয় করা; আর সাদ্দাম ও ইনানের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের হামলা সংগঠিত ও নেতৃত্ব দেওয়ার দায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ কারণেই রায়টি বিচ্ছিন্ন কয়েকটি হত্যার বিচার নয়—রাজনৈতিক নির্দেশ, দলীয় বাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় শক্তির সমন্বিত ব্যবহারের জবাবদিহি।
জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ের ব্যাপ্তি
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের অনুসন্ধান বলেছে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট ২০২৪-এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন; তাঁদের মধ্যে শতাধিক শিশু। প্রতিবেদনটি সাবেক সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগের সহিংস অংশের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের যুক্তিসংগত ভিত্তি পেয়েছে। তাই এই রায় কোনো হঠাৎ তৈরি রাজনৈতিক ভাষ্য নয়; এটি বহু সাক্ষ্য, নথি, ডিজিটাল প্রমাণ এবং আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানে উঠে আসা একটি বিস্তৃত দমনযজ্ঞের বিচারিক পরিণতির অংশ।
সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতার বিচার প্রায়ই দণ্ড ঘোষণাতেই থেমে যায়; আহত মানুষের দীর্ঘ চিকিৎসা, কর্মক্ষমতা হারানো পরিবারের আয়, মানসিক পুনর্বাসন এবং শহীদ পরিবারের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা আলোচনার বাইরে থেকে যায়। এবারের রায় সেই সীমা ভেঙেছে। পাঁচ দণ্ডিতের অর্ধেক সম্পদ বিক্রি করে ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ ন্যায়বিচারকে কেবল আদালতের কাঠগড়া থেকে মানুষের ঘরে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে।
তবে নির্দেশটি বাস্তব ফল পাবে চারটি কাজ হলে: দেশে-বিদেশে থাকা সম্পদের পূর্ণ তালিকা প্রকাশ, বেনামি বা হস্তান্তরিত সম্পদ শনাক্ত, ক্ষতিগ্রস্তদের যাচাইকৃত নিবন্ধন এবং বণ্টনের প্রতিটি ধাপ জনসমক্ষে প্রকাশ। ক্ষতিপূরণের অর্থ যেন নতুন কোনো আমলাতান্ত্রিক জট, রাজনৈতিক প্রভাব বা মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে আটকে না যায়—এটাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় দায়।
পলাতক দণ্ডিতদের আইনের আওতায় আনতে হবে
সাতজনই পলাতক থাকায় রায় কার্যকরের সামনে বাস্তব বাধা রয়েছে। রাষ্ট্রকে এখন গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, আন্তর্জাতিক পুলিশ সহযোগিতা, প্রত্যর্পণ অনুরোধ এবং বিদেশে সম্পদ শনাক্তের আইনি প্রক্রিয়া একসঙ্গে চালাতে হবে। বিচারিক রায় কাগজে রেখে দিলে জবাবদিহির বার্তা দুর্বল হবে; আইনের আওতায় এনে পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেই তা প্রাতিষ্ঠানিক নজিরে পরিণত হবে।
হাসিনার রায় থেকে আজকের রায়—দায়ের শৃঙ্খল স্পষ্ট
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর একই গণ-অভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। তাঁদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশও আসে। আজকের রায় সেই দায়কে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের আরও বিস্তৃত স্তরে নিয়ে গেছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে—ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে মাঠের দলীয় কাঠামো পর্যন্ত অপরাধে যে ভূমিকা আদালতে প্রমাণিত হবে, তার জবাবদিহি এড়ানোর সুযোগ নেই।
ন্যায়বিচারের পরবর্তী মানদণ্ড
জুলাইয়ের মানুষ প্রতিশোধের রাষ্ট্র চায়নি; তারা এমন রাষ্ট্র চেয়েছে যেখানে ক্ষমতাবানও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। তাই রায়ের পূর্ণাঙ্গ নথি সহজ ভাষায় প্রকাশ, আইনগত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা এবং ক্ষতিপূরণের প্রকাশ্য হিসাব নিশ্চিত করতে হবে। নিরপেক্ষতা ও যথাযথ প্রক্রিয়া বজায় রেখেই দণ্ডিতদের বিরুদ্ধে রায় বাস্তবায়ন করলে ভবিষ্যতের কোনো সরকার আর দলীয় বাহিনী দিয়ে নাগরিকের কণ্ঠ রোধ করার সাহস পাবে না।
এই রায় জুলাইয়ের বিচারযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু কাজ শেষ নয়। একটি প্রকাশ্য সম্পদ-তালিকা, সময়বদ্ধ ক্ষতিপূরণ কাঠামো এবং বাস্তবায়নের নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদনই দেখাবে রাষ্ট্র সত্যিই ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়িয়েছে কি না। শহীদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা তখনই পূর্ণ হবে, যখন বিচার শুধু উচ্চারিত হবে না—দৃশ্যমানভাবে কার্যকরও হবে।
তথ্যসূত্র
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনের মৃত্যুদণ্ড, দণ্ডিতদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত অভিযোগ ও আগের হাসিনা-কামাল রায়
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: সাত দণ্ডিতের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিস্তারিত বিবরণ
- ঢাকা ট্রিবিউন: পাঁচ দণ্ডিতের ৫০% সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে জুলাইয়ের ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণের নির্দেশ
- বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: রায়, অভিযোগের ধারাবাহিকতা এবং সাত আসামির ভূমিকার সারসংক্ষেপ
- জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর: জুলাই-আগস্টের দমন-পীড়ন, সর্বোচ্চ ১,৪০০ নিহতের হিসাব ও পদ্ধতিগত লঙ্ঘনের অনুসন্ধান
- AP: ১৭ নভেম্বর ২০২৫ শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের রায়
