বিডা, বেজা ও পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষকে এক করে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ এখন কার্যক্রম শুরু করেছে। বিনিয়োগকারীর জন্য এক দরজায় সেবা, কম সমন্বয়-জট এবং দ্রুত অনুমোদনের লক্ষ্যটি যুক্তিসংগত। কিন্তু তিন সংস্থার প্রকল্প, শিল্পাঞ্চল, সেবা-আবেদন, জমি বা সম্পদের নথি একত্র করার মুহূর্তেই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি আসে: পরিবর্তনের আগে ও পরে জনসাধারণ কীভাবে একই হিসাব মিলিয়ে দেখবে?
১৬ জুলাইয়ের সরকারি বিনিয়োগ-সংস্থার বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, বিলটি আগের দিন সংসদে পাস হয়েছে; একই তারিখের সরকারি গেজেটে আইনের প্রকাশিত কপি আছে। সরকারি গেজেট-তালিকায় আইনটি ২০ আগস্ট কার্যকর হওয়ার নথি আছে; ২৩ আগস্ট বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন নতুন কর্তৃপক্ষ চালু হয়েছে। অর্থাৎ এটি কেবল নতুন নাম বা প্রতীক নয়—বিনিয়োগ সহায়তা, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পিপিপি-সংক্রান্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাস্তব পুনর্বিন্যাস।
এক দরজার সুবিধা, কিন্তু তিন দপ্তরের উত্তরাধিকার
সরকারের অবস্থান পরিষ্কার: একীভূত কাঠামোতে নিবন্ধন, অনুমোদন, প্রণোদনা, আমদানি–রপ্তানি সহায়তা, শিল্পাঞ্চল ও পিপিপি সেবা আরও সমন্বিত হবে। বাসসের ২৩ আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান বিনিয়োগসেবা ব্যাহত হবে না; নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সমমানের পদে যাবেন এবং তাঁদের সেবা ও বিদ্যমান সুবিধা বজায় থাকবে। এটি রূপান্তরের পক্ষে শক্ত যুক্তি।
কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি যাচাইয়ের উপাদানও দরকার। নতুন সংস্থার প্রথম প্রকাশ্য নথিতে আলাদা করে জানানো উচিত—কোন সেবা কোন তারিখে নতুন ব্যবস্থায় গেল, কত আবেদন প্রক্রিয়াধীন, কোন প্রকল্পের সিদ্ধান্ত কোন পর্যায়ে, কোন শিল্পাঞ্চল বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ কোন কর্তৃত্বে, এবং আগের প্রতিশ্রুতির দায় কে নেবে। ২৩ আগস্টের ঘোষণায় কর্মীদের ধারাবাহিকতার কথা আছে, কিন্তু এই উত্তরাধিকারটির একত্র, সংখ্যাসহ জনসম্মুখের তালিকা নেই। সেই তালিকা চাওয়া অনিয়মের অভিযোগ নয়; সুশৃঙ্খল রূপান্তরের ন্যূনতম শর্ত।
চৌদ্দ দিনের প্রতিশ্রুতিকে মাপতে হবে
নতুন কর্তৃপক্ষ ব্যবসার লাইসেন্সে ১৪ দিনের কাঠামো চালুর জন্য কাজ করছে এবং মার্চে ঘোষিত সরকারের ১৮০ দিনের অঙ্গীকারের অগ্রগতি-প্রতিবেদন দেওয়ার কথাও জানিয়েছে। এখানে একটি জরুরি পার্থক্য আছে: এটি ভবিষ্যৎ লক্ষ্য, এখনো প্রকাশিত কর্মদক্ষতার ফল নয়। তাই ‘দ্রুত সেবা’ কথাটি যাচাই করতে মাসভিত্তিক তথ্য দরকার—কত আবেদন এসেছে, কতটি সময়সীমার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে, কোন দপ্তরে বিলম্ব হয়েছে এবং স্বয়ংক্রিয় অনুমোদনের কোনো বিধান থাকলে তা কতবার প্রয়োগ হয়েছে।
হিসাবটি পাশাপাশি রাখি। পুরোনো তিন সংস্থার শেষ ছয় মাসের একই ধরনের সেবা-সময়, মুলতবি আবেদন ও অভিযোগের ভিত্তিরেখা প্রকাশ করলে নতুন সংস্থার প্রথম ছয় মাসের ফল তুলনা করা যাবে। কোনো উন্নতি হলে তার কৃতিত্ব স্পষ্ট হবে; উন্নতি না হলে সমস্যাটি সফটওয়্যার, জনবল, নিয়ম নাকি আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ে—তাও বোঝা যাবে। ভিত্তিরেখা ছাড়া ‘এক জানালা’ কেবল একটি ভালো অভিপ্রায় হয়ে থাকে।
চুক্তিভিত্তিক নেতৃত্বে নথির মানদণ্ড আরও উঁচু
চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনকে এক বছরের চুক্তিতে চেয়ারম্যান করা হয়েছে। বাসসের প্রতিবেদনে প্রজ্ঞাপনের যে শর্তটি এসেছে, তাতে অন্য পেশা, ব্যবসা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক ত্যাগের কথা আছে; অন্য শর্ত চুক্তিপত্রে ঠিক হবে। এই নিয়োগ থেকে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয় না। বরং নতুন সংস্থার ক্ষমতা বড় হওয়ায় জনস্বার্থের পরীক্ষা হওয়া উচিত আরও স্পষ্ট: চুক্তির প্রাসঙ্গিক শর্ত, দায়িত্বের পরিমাপযোগ্য সূচক এবং সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের স্বার্থ-ঘোষণার নিয়ম প্রকাশ করা হবে কি না।
- প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে তারিখসহ উত্তরাধিকার-নথি: চলমান সেবা, প্রকল্প, শিল্পাঞ্চল, জমি বা সম্পদ, দায় এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরের একত্র তালিকা।
- প্রতি মাসে সেবা-ড্যাশবোর্ড: আবেদনের সংখ্যা, মধ্যম নিষ্পত্তি-সময়, সময়সীমা মানার হার, মুলতবি কারণ ও অভিযোগ নিষ্পত্তি।
- প্রতিশ্রুত অগ্রগতি-প্রতিবেদনের সঙ্গে পূর্ববর্তী তিন সংস্থার তুলনাযোগ্য ভিত্তিরেখা এবং চেয়ারম্যানের দায়িত্ব-সূচক প্রকাশ।
রূপান্তরকে যাচাইযোগ্য করাই এখন সরকারের কাজ
বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এই নতুন কর্তৃপক্ষের সামনে সুযোগটি বড়: বিনিয়োগসেবা সত্যিই কম জটিল করা। তবে একই কেন্দ্রে বেশি ক্ষমতা জড়ো হলে নথি, সময়সীমা ও সিদ্ধান্তের পথও আরও পরিষ্কার হতে হয়। আমাদের বিবেচনায়, প্রথম অগ্রগতি-প্রতিবেদনটি শুধু সাফল্যের বিবরণ না হয়ে উত্তরাধিকার-হিসাব, সেবা-ফল এবং অপূর্ণতার প্রকাশ্য পরীক্ষা হওয়া উচিত। তবেই বিনিয়োগের গতি বাড়ার দাবির সঙ্গে জনগণের জানার অধিকারও এগোবে।
তথ্যসূত্র
- পাবলিক–প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ: ‘Invest Bangladesh Act, 2026’—সরকারি আইন-নথি
- সরকারি মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তর: ‘অগাস্ট ২০২৬—অতিরিক্ত সংখ্যা’—২০ আগস্টের ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন কার্যকরের গেজেট-তালিকা
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: ‘Invest Bangladesh begins operations as apex investment promotion agency’—২৩ আগস্ট ২০২৬
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হলেন চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন’—২৩ আগস্ট ২০২৬
- বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ: ‘Invest Bangladesh to be Formed as Bangladesh’s Apex Investment Development Agency by Unifying BIDA, BEZA and PPPA’—১৬ জুলাই ২০২৬
- মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ: ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিগণ’—বর্তমান সরকার ও দায়িত্বের সরকারি তালিকা
