আপডেট, ৫ সেপ্টেম্বর: ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে ওঠা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলের ওপর সংশ্লিষ্ট কমিটি দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিয়েছে। প্রতিবেদন নিয়ে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের বর্ণনায় কিছু বাস্তব উন্নতি আছে: কমিশনে সংখ্যালঘু বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব, মানবাধিকার প্রতিবেদনে অভিজ্ঞ সাংবাদিককে অনুসন্ধান কমিটিতে রাখার প্রস্তাব, এবং কিছু স্থানে আগাম অনুমতি ছাড়া পরিদর্শনের সুযোগ। কিন্তু গুমের তদন্ত সত্যিই স্বাধীন হবে কি না, সেই মূল প্রশ্নে কী পরিবর্তন হয়েছে—তার ধারা-ভিত্তিক সরকারি ব্যাখ্যা এখনো জরুরি।
এটি ২৮ আগস্টের ‘গুমবিরোধী আইন দরকার—কিন্তু তদন্ত যদি স্বাধীন না হয়’ লেখার অনুসরণী প্রতিবেদন। আগের লেখার প্রশ্ন ছিল প্রস্তাবিত তদন্ত-কাঠামো নিয়ে। নতুন ঘটনা হলো কমিটি-পর্ব শেষ হওয়া, সংশোধনের সুপারিশ এবং ৩ সেপ্টেম্বর সংসদে দ্রুত আইন বিতরণ ও পরীক্ষার সময় নিয়ে ডেপুটি স্পিকারের প্রকাশ্য উদ্বেগ। তাই এই লেখার উদ্দেশ্য বিলকে আগেভাগে ব্যর্থ ঘোষণা করা নয়; বরং কী উন্নতি নথিবদ্ধ হলো, কোন জবাব এখনো অসম্পূর্ণ, তা আলাদা করে দেখা।
কী ঘটেছে, সময়রেখাটি কী বলে?
বাসসের ২৭ আগস্টের সংসদ-প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইনমন্ত্রী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপন করেন। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল দুটি বিল সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটিতে পাঠিয়ে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেন। একই প্রতিবেদনে সরকার বিল দুটির উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছে: মানবাধিকারের সুরক্ষা, গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে দেখা, পরিবারকে সহায়তা দেওয়া এবং ন্যায়বিচারের পথ তৈরি করা। এই লক্ষ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট।
২ সেপ্টেম্বর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও দ্য ডেইলি স্টার জানায়, কমিটি-রিপোর্ট সংসদে উপস্থাপিত হয়েছে। সংবাদদুটি একই মূল ঘটনায় একমত: মানবাধিকার কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনারের কাঠামোর সঙ্গে নারী সদস্যের পাশাপাশি প্রান্তিক বা সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের সুপারিশ এসেছে। অনুসন্ধান কমিটিতে মানবাধিকার প্রতিবেদন-অভিজ্ঞ একজন সাংবাদিক রাখার প্রস্তাবও এসেছে। দ্য ডেইলি স্টারের বর্ণনা অনুযায়ী, তদন্তকালে কিছু প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে ‘উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন’ নেওয়ার বাক্যটি বাদ দেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে।
এই পরিবর্তনগুলোকে ছোট করে দেখা ঠিক হবে না। প্রতিনিধিত্ব বাড়লে কমিশনের অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে। আগাম অনুমতির শর্ত বাদ গেলে পরিদর্শনের বাস্তব ক্ষমতাও শক্ত হতে পারে। তবে প্রস্তাবিত সংশোধন মানেই যে তা ইতিমধ্যে আইন হয়ে গেছে, তা নয়। সংসদে পাস এবং পরের আইনি প্রকাশনা না হওয়া পর্যন্ত এগুলো সুপারিশ মাত্র। তাই বর্তমান আইন বা চূড়ান্ত ধারা নিয়ে নিশ্চিত ভাষা ব্যবহার করা ঠিক হবে না।
সরকারের যুক্তি ও প্রক্রিয়াগত উত্তর
সরকারের অবস্থানকে দুর্বল করে উপস্থাপন করার কারণ নেই। ২৭ আগস্ট বিল উত্থাপনের সময় আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার রাজনৈতিক দল, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও অন্য অংশীজনের সঙ্গে পরামর্শ করে স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো করতে চায়। গুম বিলের উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আইনের শাসন রক্ষার কথা বলেছেন। বাসসের প্রতিবেদনে আদালতের তল্লাশি পরোয়ানা, ডিজিটাল প্রমাণ, সাক্ষী ও অভিযোগকারীর সুরক্ষা, বিশেষ তহবিল এবং পরিবারকে তদন্তের খবর দেওয়ার প্রস্তাবের কথাও আছে। এগুলো থাকলে আইনটি কেবল শাস্তির তালিকা নয়, প্রতিকার-কাঠামোও হতে পারে।
কমিটি-পর্ব নিয়ে প্রশ্নেরও সরকারি উত্তর আছে। ২ সেপ্টেম্বর সংসদ সচিবালয় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছে, আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটি বিস্তারিত আলোচনা করেছে এবং সংশোধনসহ বিল পাসের সুপারিশ করেছে। ৩ সেপ্টেম্বর ইউএনবি-ভিত্তিক প্রতিবেদনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অধিবেশনের মেয়াদ না বাড়লে আইনগুলো ৮ বা ৯ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পাস করা দরকার। অর্থাৎ সরকারের যুক্তি হলো, অধিবেশনের সময়সীমার মধ্যে প্রয়োজনীয় আইন এগোনো এবং কমিটি-আলোচনার মাধ্যমে তা করা।
এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। ‘দ্রুত পাস করতে হবে’ একটি প্রক্রিয়াগত ব্যাখ্যা; এটি নিজে প্রমাণ করে না যে সব গুরুত্বপূর্ণ ধারা যথেষ্ট সময় নিয়ে যাচাই হয়েছে। একই ইউএনবি-ভিত্তিক প্রতিবেদনে ডেপুটি স্পিকার বলেন, বিল মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের পর সংসদ সদস্যদের কাছে যথাসময়ে পৌঁছানো উচিত, যাতে তাঁরা পরীক্ষা করতে পারেন। তাঁর ভাষ্যে কমিটিতে পাঠানো আর সব সদস্যের পর্যালোচনার সুযোগ এক কথা নয়। এই বক্তব্য সরকারের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়; আইনপ্রণয়নের গুণগত মান নিয়ে সংসদের ভেতরকার একটি প্রাসঙ্গিক সতর্কতা।
স্বাধীন তদন্তের প্রশ্নে নতুন তথ্য কী, আর কী নয়
গুম বিলে কমিটি গুমের সংজ্ঞার ভাষা বদলানোর সুপারিশ করেছে বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়। কিন্তু একই প্রতিবেদনে মূল তদন্ত-পদ্ধতিতে স্বাধীন নতুন সংস্থা গঠনের সুপারিশের কথা নেই। দ্য ডেইলি স্টারও ২ সেপ্টেম্বর লিখেছে, গুম বিলের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সুপারিশ হয়নি। এগুলো সংবাদমাধ্যমের কমিটি-রিপোর্টভিত্তিক বর্ণনা; পূর্ণ চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা পাস হওয়া আইন প্রকাশ ছাড়া এর চেয়ে বড় সিদ্ধান্ত টানা ঠিক নয়।
টিআইবি ৩ সেপ্টেম্বরের বিবৃতিতে বলেছে, সংশোধনের কিছু দিক ইতিবাচক হলেও স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বার্থসংঘাতমুক্ত তদন্তের মৌলিক ঘাটতি রয়ে গেছে। সংস্থাটির মতে, গুম বিলে ১৪(৩) ধারা অভিযুক্ত বাহিনীকে নিজের সদস্যের তদন্ত থেকে বিরত রাখলেও অন্য কোনো শৃঙ্খলাবাহিনী বা আন্তঃবাহিনী দলকে তদন্ত দেওয়ার সুযোগ রাখে। এটি টিআইবির আইন-পাঠ ও মূল্যায়ন, আদালত বা সংসদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। তবু এটি হালকা করে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না, কারণ প্রশ্নটি সেই প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে যার কাছে অভিযোগকারীর পরিবারকে প্রমাণ ও নিরাপত্তার জন্য যেতে হবে।
সরকারের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী পাল্টা বক্তব্য হলো—বিলে বিচার, তল্লাশি, ডিজিটাল প্রমাণ, সাক্ষী-সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ ও তথ্যভান্ডারের ব্যবস্থা আছে; কমিটিও প্রতিনিধিত্ব ও পরিদর্শন ক্ষমতায় উন্নতি এনেছে। এই বক্তব্যের ওজন আছে। কিন্তু সেটি তদন্তকারীর প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্বের প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর নয়। কোনো অভিযোগে যদি পুলিশের, গোয়েন্দা সংস্থার বা একাধিক শৃঙ্খলাবাহিনীর বিরুদ্ধে তথ্য-নথি চাওয়ার প্রয়োজন হয়, তবে তদন্তকারী কোন কর্তৃত্বে নথি চাইবে, কে তাকে নিয়োগ বা বদলি করতে পারবে, এবং তদন্তের মধ্যে অভিযোগকারী কীভাবে নিরাপদ থাকবেন—এসবের স্পষ্ট উত্তর দরকার।
দুই দিনের মধ্যে কী পরীক্ষা করা সম্ভব?
দুই কার্যদিবস মানে দুই ক্যালেন্ডার-দিন নয়; সংসদের কার্যদিবস অনুযায়ী হিসাব। তবু সময় কম হওয়া মানেই কমিটি কোনো কাজ করেনি—এ সিদ্ধান্তও তথ্যসম্মত নয়। সংসদ সচিবালয় বিস্তারিত আলোচনার কথা বলেছে, আর সংবাদমাধ্যমে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সংশোধনের খবর এসেছে। বিপরীত দিক হলো, এমন আইনে ভাষা, তদন্ত-পথ, সাক্ষী-সুরক্ষা, বাজেট ও আপিলের সুযোগ একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত থাকে। সংশ্লিষ্ট পরিবার, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী, তদন্তকারী ও সংসদ সদস্যের মতামত নেওয়ার জন্য দুই কার্যদিবস যথেষ্ট ছিল কি না—সেই প্রশ্নের উত্তর একটি প্রকাশ্য পরামর্শ-তালিকা ছাড়া যাচাই করা যায় না।
এখানে বিরোধী সদস্যদের আপত্তিও প্রসঙ্গভিত্তিক, কিন্তু তা প্রমাণ নয়। ২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে কয়েকজন বিরোধী সদস্য বলেছেন, তাঁরা আলোচনায় অংশ নেননি বা তাঁদের লিখিত বক্তব্য ঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি। অন্যদিকে কমিটি চেয়ারম্যান এবং মন্ত্রীরা বলেছেন, সদস্যরা প্রাথমিক বক্তব্য দিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগে বেরিয়ে গিয়েছিলেন; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, লিখিত ‘নোট অব ডিসেন্ট’ হলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত হতো। দুই দাবি পরস্পরবিরোধী। প্রকাশ্য কার্যবিবরণী, লিখিত আপত্তি ও কমিটি-প্রতিবেদন প্রকাশ হলে নাগরিক এই বিরোধ যাচাই করতে পারবেন।
এখন কোন নথি প্রকাশ করা উচিত?
- মানবাধিকার কমিশন ও গুমবিরোধী দুই বিলের কমিটি-রিপোর্ট, প্রস্তাবিত প্রতিটি সংশোধন এবং কোন সদস্য কীভাবে ভোট বা মত দিয়েছেন তার সহজলভ্য সংস্করণ প্রকাশ করা।
- মূল খসড়া, কমিটি-সংশোধিত পাঠ ও চূড়ান্ত পাসের পাঠ পাশাপাশি দিয়ে ধারা-ভিত্তিক পরিবর্তনের ব্যাখ্যা প্রকাশ করা।
- গুমের অভিযোগে তদন্তের নিয়োগ, নথি-তলব, বাহিনীগত স্বার্থসংঘাত, সাক্ষী-সুরক্ষা এবং পরিবারকে অগ্রগতি জানানোর নিয়ম স্পষ্ট করে সরকারি প্রশ্নোত্তর দেওয়া।
- কমিটির বৈঠকের তারিখ, কারা উপস্থিত ছিলেন, কার কাছ থেকে লিখিত বা মৌখিক মতামত নেওয়া হয়েছে এবং ভিন্নমত কীভাবে বিবেচিত হয়েছে তা জানানো।
- আইন পাসের আগে সংসদ সদস্য ও নাগরিকের জন্য যথেষ্ট সময় দিয়ে পাঠ্যটি সহজে ডাউনলোড ও অনুসন্ধানযোগ্য রাখা।
কার লাভ, কার ঝুঁকি?
একটি কার্যকর আইন হলে প্রথম লাভবান হবেন নিখোঁজ ব্যক্তির পরিবার। তাঁরা অভিযোগের একটি আইনি নাম, আদালতের কাছে যাওয়ার পথ, সম্ভাব্য সুরক্ষা এবং ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনের কাঠামো পাবেন। বাসসের প্রতিবেদনে পরিবারকে তদন্তের অগ্রগতি ও নিখোঁজ ব্যক্তির পরিণতি জানার অধিকারের প্রস্তাবের কথাও আছে। দীর্ঘ অনিশ্চয়তায় থাকা পরিবারের কাছে এটি কেবল আইনি শব্দ নয়; চিকিৎসা, আয়, সম্পত্তি, শিশুদের পড়াশোনা ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত বাস্তব বিষয়।
মানবাধিকার কমিশনের ক্ষেত্রে নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের সুপারিশও কেবল প্রতীকী বিষয় নয়। অভিযোগ গ্রহণের ভাষা, কোন ধরনের ঝুঁকি অগ্রাধিকার পাবে এবং ভুক্তভোগী প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা রাখবেন কি না—এসবের ওপর কমিশনের বহুত্বের প্রভাব থাকতে পারে। সাংবাদিককে অনুসন্ধান কমিটিতে রাখার প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হলে জনস্বার্থ-তথ্য ও মানবাধিকার প্রতিবেদন সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতাও নির্বাচনী আলোচনায় আসতে পারে। তবে প্রতিনিধিত্ব একা আর্থিক, প্রশাসনিক বা তদন্তের স্বাধীনতার বিকল্প নয়।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয় যখন ভালো উদ্দেশ্যের আইন প্রয়োগের জায়গায় অস্পষ্ট থাকে। অভিযোগকারী যদি না জানেন কোন সংস্থা তদন্ত করবে, সেই সংস্থা কার কাছে জবাবদিহি করবে, বা প্রমাণ নষ্ট হওয়ার আগে কী সুরক্ষা পাওয়া যাবে, তাহলে কাগজে থাকা অধিকার ব্যবহার করা কঠিন হয়। আবার তদন্তকারী কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানও পরিষ্কার আইনগত ক্ষমতা ছাড়া তথ্য চাইতে এবং সাক্ষীকে নিরাপদ রাখতে সমস্যায় পড়তে পারে। তাই স্বাধীনতার প্রশ্নটি কোনো একটি পক্ষের রাজনৈতিক স্লোগান নয়; আইনের বাস্তব ব্যবহারযোগ্যতার পরীক্ষা।
চূড়ান্ত পাঠে কোন পরীক্ষা হওয়া উচিত?
সংসদে পাসের আগে একটি সহজ পরীক্ষা করা যায়। ধরা যাক, কোনো পরিবারের অভিযোগে একাধিক শৃঙ্খলাবাহিনী বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রয়োজন। চূড়ান্ত আইনের ভাষা থেকে কি বোঝা যাবে, তদন্তকারী কার কাছে নথি চাইবেন, কত সময়ে উত্তর পাবেন, উত্তর না এলে কী প্রতিকার হবে এবং অভিযোগকারীকে কে নিরাপত্তা দেবে? আরেকটি পরীক্ষা হলো, তদন্তের অগ্রগতি না জানালে পরিবার কি স্বাধীনভাবে আদালত বা কমিশনের কাছে যেতে পারবে? প্রশ্নগুলোর উত্তর স্পষ্ট হলে সরকারের ঘোষিত মানবিক মর্যাদা ও আইনের শাসনের লক্ষ্য মাপা সম্ভব হবে।
স্বাধীনতা মানে তদন্তের ফল আগে থেকে ঠিক করে দেওয়া নয়। বরং সেটি এমন প্রক্রিয়া, যেখানে প্রমাণের উৎস, সিদ্ধান্তের কারণ এবং ভিন্নমতের সুযোগ যাচাই করা যায়। অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নির্দোষ হলে একটি বিশ্বাসযোগ্য স্বাধীন প্রক্রিয়াই সেটি পরিষ্কার করতে পারে; অভিযোগ সত্য হলে একই প্রক্রিয়া দায়িত্ব নির্ধারণে সাহায্য করে। এ কারণে প্রাতিষ্ঠানিক দূরত্ব ন্যায্যতার বিপরীত নয়, সবার জন্য ন্যায্যতার সুরক্ষা।
কমিটির দ্রুততার বাস্তব কারণ থাকতে পারে। অধিবেশন সীমিত, আইনগুলোর প্রয়োজনও দীর্ঘদিনের। কিন্তু সময়সীমা থাকলে স্বচ্ছতার দায় আরও বাড়ে: কোন খসড়া কখন সদস্যদের দেওয়া হলো, কোন সংশোধন কার প্রস্তাবে এল, কোন আপত্তি গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান হলো—এসব সংক্ষিপ্ত সারণিতে প্রকাশ করা কঠিন নয়। এতে পরে কেউ বলতে পারবে না যে দ্রুততার নামে আলোচনার দরজা বন্ধ ছিল; আবার সরকারও দেখাতে পারবে যে সংশোধনগুলি শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, নথিভুক্ত সিদ্ধান্ত।
বড় ছবিটা কী?
গুমকে অপরাধ হিসেবে স্পষ্ট করা, পরিবারকে প্রতিকার দেওয়া এবং মানবাধিকার কমিশনের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর জায়গা আছে। একই সঙ্গে একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রে আইনের পরীক্ষা কেবল তার উদ্দেশ্য-ঘোষণায় নয়; অভিযোগ উঠলে কে কাকে তদন্ত করবে, তথ্য কোথা থেকে আসবে এবং তদন্তকারীর ওপর কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে—সেখানে। কমিটি-রিপোর্টে কিছু দরজা খুলেছে, বিশেষ করে প্রতিনিধিত্ব ও পরিদর্শনের বিষয়ে। কিন্তু তদন্তের স্বাধীনতার দরজাটি কতটা খুলল, তা এখনো নাগরিক সহজে দেখতে পাচ্ছেন না।
উপসংহার: পাসের আগে পরিষ্কার উত্তরই সরকারের শক্তিশালী জবাব
এই দুই বিল দ্রুত পাস করাই সরকারের একমাত্র সাফল্য হবে না। আসল সাফল্য হবে এমন পাঠ পাস করা, যেখানে ভুক্তভোগী পরিবার জানবে অভিযোগ কোথায় দেবে, তদন্তকারী কোনো অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের অধীন নয়, এবং বিলের প্রতিটি পরিবর্তন প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করা আছে। সরকারের ইতিবাচক সংশোধনগুলোকে নথিবদ্ধ করাই ন্যায্যতা। টিআইবির আপত্তিকে চূড়ান্ত সত্য না মেনে তার ধারাভিত্তিক জবাব প্রকাশ করাই জবাবদিহি। সংসদ যদি এই স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে, তাহলে দ্রুততার সঙ্গে আস্থাও তৈরি হবে।
তথ্যসূত্র
- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর সরকারি খসড়া প্রকাশ, ২৭ জুলাই ২০২৬
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধ বিল উত্থাপন এবং দুই কার্যদিবসের কমিটি-সময়সীমা, ২৭ আগস্ট ২০২৬
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, কমিটি-প্রস্তাব, গুমের সংজ্ঞার সংশোধন ও সংসদ সচিবালয়ের বক্তব্য, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- দ্য ডেইলি স্টার, মানবাধিকার কমিশন বিলে প্রতিনিধিত্ব ও অনুমতি ছাড়া পরিদর্শনের প্রস্তাবিত পরিবর্তন, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, কমিটি-সংশোধনের পরও তদন্ত-স্বাধীনতা নিয়ে অবস্থান, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- ইউএনবি-ভিত্তিক গ্রীনওয়াচবিডি প্রতিবেদন, বিল আগাম বিতরণ ও সময়সীমা নিয়ে ডেপুটি স্পিকার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
