১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত SCANeDalous with SameerScane-এর নতুন পর্বে কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও NCP-র দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহকে আন্দোলনের পরিচিত ভাষার পাশাপাশি নীতি, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। তাঁর সামনে এখন দ্বৈত দায়িত্ব—সংসদে সরকারকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা এবং প্রমাণ করা যে জুলাই থেকে উঠে আসা রাজনৈতিক শক্তি প্রতিবাদের সঙ্গে কার্যকর বিকল্প নীতিও দিতে পারে।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন: অসমাপ্ত বিচারের প্রশ্ন
শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণার প্রসঙ্গে হাসনাত বলেন, তিনি চান শেখ হাসিনা ফিরে আদালতের মুখোমুখি হোন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল জুলাই–আগস্টের দমন-পীড়নসংক্রান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তিনি ভারতে অবস্থান করছেন এবং বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ ভারতীয় কর্তৃপক্ষের আইনি পর্যালোচনায় রয়েছে।
জাতিসংঘের অনুসন্ধানে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন বলে অনুমান করা হয়েছে। প্রতিবেদনে তৎকালীন সরকার, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট সহিংস গোষ্ঠীর পরিকল্পিত গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের যুক্তিসংগত ভিত্তি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই বাস্তবতায় প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নটি কেবল একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার প্রশ্ন নয়; এটি ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার, প্রমাণনির্ভর বিচারপ্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রীয় অপরাধের দায় নির্ধারণের প্রশ্ন।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে বাংলাদেশের মর্যাদার ভিত্তিতে
হাসনাতের বক্তব্য—ভারত যদি বাংলাদেশকে শুধু আওয়ামী লীগের চোখ দিয়ে দেখে, সেটি হবে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভুল। দুই দেশের বাণিজ্য, চিকিৎসা, সংস্কৃতি ও মানুষের যোগাযোগের কারণে সহযোগিতা জরুরি; কিন্তু সম্পর্ক কোনো নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে বিশেষ বোঝাপড়ার ওপর দাঁড়াতে পারে না। সম্পর্ক হতে হবে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের, নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে সরকারের এবং পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌমত্ব ও সমতার ভিত্তিতে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি: সম্ভাবনা আছে, স্বচ্ছতাও চাই
বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির কিছু সম্ভাবনা স্বীকার করেও হাসনাত প্রশ্ন তুলেছেন—এত গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তির শর্ত সংসদ ও জনগণের সামনে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে না কেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী অধিকাংশ বাংলাদেশি পণ্যে ১৯ শতাংশ reciprocal tariff বহাল থাকবে, নির্দিষ্ট কিছু পণ্য শূন্য হারের সুবিধা পাবে এবং গম, সয়াবিন ও তুলাসহ প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন কৃষিপণ্য কেনার বাণিজ্যিক পরিকল্পনা রয়েছে। লাভ–ক্ষতি দুটিই প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করা নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব।
বিদ্যুৎ সংকট: উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সমস্যা, বর্তমান সরকারেরও দায়
২০২৬ সালের এপ্রিলে পাওয়ার ডিভিশনের হিসাবে এক দিনে সম্ভাব্য চাহিদা ছিল প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট, উৎপাদন সম্ভব হচ্ছিল প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট এবং ঘাটতি ছিল প্রায় তিন হাজার মেগাওয়াট। গ্যাসের ঘাটতি, কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের কম উৎপাদন এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা সংকটকে বাড়িয়েছে। হাসনাত স্বীকার করেন, এর বড় অংশ আগের সরকারের রেখে যাওয়া; তবে সমস্যার উত্তরাধিকার বর্তমান সরকারকে পরিকল্পনা, সৎ যোগাযোগ ও ফল দেওয়ার দায় থেকে মুক্ত করে না।
তিনি অবৈধ ও হিসাববহির্ভূত সংযোগ বন্ধ, সৌর প্যানেল–ইনভার্টার–ব্যাটারিতে কর কমানো, শিল্পের rooftop solar ব্যবহারে প্রণোদনা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং আমদানির উৎস বহুমুখী করার কথা বলেন। তাঁর দাবি, NCP সরকারকে ১৫ দফা জ্বালানি প্রস্তাব দিয়েছে। এখন প্রয়োজন প্রতিটি প্রস্তাবের খরচ, সময়সীমা ও প্রত্যাশিত ফল প্রকাশ করা—তাহলেই মানুষ বুঝবে কোনটি রাজনৈতিক বক্তব্য আর কোনটি বাস্তবায়নযোগ্য বিকল্প।
ফ্যামিলি কার্ড: সহায়তা প্রয়োজন, কিন্তু ব্যবস্থাটি কি টেকসই?
ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে হাসনাতের মূল প্রশ্ন—দেশ যখন বিদ্যুৎ, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন সংকটে, তখন বিপুল নগদ সহায়তা মানুষকে স্বনির্ভর করবে, নাকি রাজনৈতিক নির্ভরশীলতা বাড়াবে? সরকারি পরিকল্পনায় পাঁচ বছরে সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা; এর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার ৩৩০ কোটি টাকা জরিপ ও সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে ব্যয়ের প্রাক্কলন রয়েছে।
বাংলাদেশে ২৫টি মন্ত্রণালয়ের অধীনে ৯৯টি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি রয়েছে। সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে Family Card বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থাগুলোকে এক কাঠামোয় আনতে পারে। কিন্তু সাফল্য নির্ভর করবে উপকারভোগী নির্বাচন, তথ্যের নিরাপত্তা, ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তি এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত বাস্তবায়নের ওপর। সামাজিক নিরাপত্তা প্রয়োজন; তবে স্থায়ী মুক্তি আসে কর্মসংস্থান, দক্ষতা ও উৎপাদনশীল সুযোগ থেকে—নগদ সহায়তা কখনোই এসবের বিকল্প নয়।
প্রধানমন্ত্রী জনপ্রিয়, কিন্তু সরকার কেন পিছিয়ে?
Doppler Opinion Research-এর আগস্টের জরিপে ৬৬.৩ শতাংশ উত্তরদাতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাজকে ইতিবাচকভাবে দেখেছেন, অথচ সরকারের সামগ্রিক কাজের ইতিবাচক মূল্যায়ন ৫৪.৫ শতাংশ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও দ্রব্যমূল্যকে মানুষ সবচেয়ে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। হাসনাতের বিশ্লেষণ সহজ—অধিনায়কের ব্যক্তিগত আচরণ ভালো হলেও দল ম্যাচ হারলে শেষ পর্যন্ত অধিনায়ককেই দায় নিতে হয়। ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাকে টেকসই করতে হলে সেটিকে মন্ত্রীদের কাজ, সেবা ও প্রাতিষ্ঠানিক ফলাফলে রূপ দিতে হবে।
NCP–জামায়াত সম্পর্ক: জোট মানেই আদর্শের একীভবন নয়
জামায়াতের সঙ্গে NCP-র সম্পর্ক বোঝাতে হাসনাত বলেন, দুই ব্যক্তি একই গন্তব্যের বাসে উঠতে পারেন, কিন্তু তাঁদের বিশ্বাস ও পরবর্তী ঠিকানা এক হওয়া জরুরি নয়। সাংবিধানিক সংস্কার বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যে সহযোগিতা থাকতে পারে; নারী নেতৃত্ব, বহুত্ববাদ, নৈতিক পুলিশিং ও রাষ্ট্র পরিচালনায় NCP-র নিজস্ব অবস্থান রয়েছে। এই স্বাতন্ত্র্য শুধু কথায় নয়—প্রার্থী নির্বাচন, সংসদীয় ভোট ও দলীয় নীতিতে দৃশ্যমান করতে হবে।
সংসদের সীমা এবং নীতিনির্ভর বিরোধী রাজনীতি
হাসনাতের অভিজ্ঞতায় সংসদের কার্যপ্রণালী, সময়সীমা ও সম্প্রচারব্যবস্থা একজন সদস্যের বক্তব্য পুরোপুরি মানুষের কাছে পৌঁছানো কঠিন করে তোলে। এটি আন্দোলনের রাজনীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির পার্থক্যও দেখায়। NCP-র সুযোগ হলো—সমালোচনার সঙ্গে লিখিত নীতিপ্রস্তাব, বিকল্প বাজেট, তথ্যচিত্র ও নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা। সংসদে সময় কম হলেও প্রমাণভিত্তিক রাজনীতির জায়গা ছোট হতে হবে না।
উত্তরাধিকার নয়, যোগ্যতার রাজনীতি
নিজের সন্তান ভবিষ্যতে রাজনীতিতে এলে কী করবেন—এমন প্রশ্নে হাসনাত বলেন, শুধু তাঁর ছেলে হওয়ার কারণে কেউ যেন পদ না পায়; আগ্রহ ও যোগ্যতা থাকলে সাধারণ সদস্য হিসেবে শুরু করে এগোতে হবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যের সন্তানকে মাঠের সংঘাতের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজের সন্তানকে উত্তরাধিকারসূত্রে পদ দেওয়ার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান। NCP-কে নিজের সংগঠনেও একই মানদণ্ড কার্যকর করে দেখাতে হবে।
প্রতিবাদ থেকে নীতি-রাজনীতির পথে
এই সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক কোনো একক বিতর্কিত বাক্য নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রতিবাদী রাজনীতি থেকে নীতিনির্ভর বিরোধী রাজনীতির দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা। হাসনাত সরকারকে সমালোচনা করেছেন, কয়েকটি ক্ষেত্রে বিকল্পও দিয়েছেন; আগের সরকারের অপরাধের বিচার চেয়েছেন, বর্তমান সরকারকেও জবাবদিহির বাইরে রাখেননি। আবেগ মানুষকে আন্দোলনে যুক্ত করে, কিন্তু রাষ্ট্র চালাতে প্রয়োজন তথ্য, যোগ্য প্রতিষ্ঠান, বাস্তবায়নযোগ্য নীতি এবং ভুল স্বীকার করার সাহস।
সম্পাদকীয় নোট: নিবন্ধে সাক্ষাৎকারে হাসনাত আবদুল্লাহর রাজনৈতিক মতামতকে তাঁর বক্তব্য হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে। সংখ্যা ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য আলাদা নির্ভরযোগ্য উৎস দিয়ে যাচাই করা হয়েছে; কোনো রাজনৈতিক বক্তব্যকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে ধরা হয়নি।
তথ্যসূত্র
- SameerScane: MP Hasnat Abdullah | Hasina Return, BNP Failure & Jamaat Scandal!?
- জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর: জুলাই–আগস্ট ২০২৪-এর মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে অনুসন্ধান প্রতিবেদন
- AP: শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার ঘোষণা, দণ্ড ও প্রত্যর্পণ পরিস্থিতি
- USTR: যুক্তরাষ্ট্র–বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির সরকারি তথ্যপত্র
- The Business Standard: ১৭ হাজার মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে তিন হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি
- Prothom Alo: ফ্যামিলি কার্ডের পাঁচ বছরের প্রাক্কলিত ব্যয় ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনা
- সরকারি Social Security Policy Support Programme: Family Card কাঠামো ও বাস্তবায়নের শর্ত
- The Daily Star: Doppler Approval Rating Survey 2026
