একটি রাষ্ট্র ১৮০ দিনে বদলে যায় না। কিন্তু ১৮০ দিনেই বোঝা যায়—সরকার কোন দিকে হাঁটছে, কোন সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং নিজের ক্ষমতার ওপর সীমা টানতে কতটা প্রস্তুত। ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের মানুষ একই দিনে দুটি সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন: কারা সরকার গঠন করবে এবং জুলাই জাতীয় সনদের রাষ্ট্রসংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হবে কি না। তাই সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের হিসাব শুধু প্রকল্প, কার্ড বা ঘোষণার তালিকা দিয়ে শেষ করা যায় না; দেখতে হবে জনগণের সেই দ্বিতীয় রায়টি রাষ্ট্রে কতটা পৌঁছেছে।
NCP Diaspora Alliance Germany-এর প্রকাশিত মূল্যায়ন এই প্রশ্নটিই সামনে এনেছে। এটি সরকারের সব কাজকে অস্বীকার করে না। প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণ, কিছু আর্থিক শৃঙ্খলা ও সম্পদ ফেরানোর উদ্যোগ, প্রবাসী কার্ডের সূচনা এবং জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি ৯.১৬ থেকে ৮.৩২ শতাংশে নামা—এসব ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু নির্বাচিত সরকারের শক্তি যেমন জনগণের ম্যান্ডেট, তার জবাবদিহিও তত বড়। অগ্রগতির স্বীকৃতি তাই কোনো খালি চেক নয়।
গণভোটে মানুষ কী অনুমোদন করেছিলেন?
নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত ফল অনুযায়ী ‘হ্যাঁ’ ভোট ছিল ৪ কোটি ৭২ লাখ ২৫ হাজার ৯৮০ এবং ‘না’ ভোট ২ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ২৩১। অর্থাৎ বৈধ ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’ ভোটের মধ্যে প্রায় ৬৮.৩ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ বলেছেন। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছিল, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হবেন; পরিষদের প্রথম অধিবেশন ৩০ দিনের মধ্যে শুরু হবে এবং প্রথম অধিবেশন থেকে ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে সংস্কার শেষ হবে।
কিন্তু সেই পরিষদ কার্যকর হয়নি। ১৩ জুলাই সংসদে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা পরে বিরোধী সদস্য যুক্ত করে ১৭ সদস্যে উন্নীত করা যেতে পারে। সরকারের বক্তব্যও জানা জরুরি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, বর্তমান সংবিধানের অধীনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দ্বিতীয় শপথের আইনি ভিত্তি নেই; তাই সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই গণভোটের রায়কে সম্মান করতে হবে। অর্থাৎ এখানে একটি বাস্তব আইনগত ও রাজনৈতিক বিরোধ আছে।
তবু প্রশ্নটি থেকে যায়। যে দল নির্বাচনের আগে ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়েছে, ক্ষমতায় এসে যদি অনুমোদিত প্রক্রিয়াটিকেই অকার্যকর মনে করে, তবে কেন, কোন আইনি ব্যাখ্যায় এবং কোন বিকল্প সময়সূচিতে একই ফল নিশ্চিত হবে—সেটি জনগণকে লিখিতভাবে জানানো দরকার। বিশেষ কমিটি গঠন করাই যথেষ্ট নয়; খসড়া প্রকাশ, উন্মুক্ত জনপরামর্শ, বিরোধী পক্ষের কার্যকর অংশগ্রহণ এবং কাজ শেষের নির্দিষ্ট তারিখ না থাকলে গণভোটের রায় দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভেতর হারিয়ে যেতে পারে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কেন এই বিতর্ককে আরও জরুরি করেছে
জুলাই সনদের সংস্কার পরিকল্পনায় দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য এবং ৭০ অনুচ্ছেদের পরিবর্তনের প্রশ্ন ছিল। কিন্তু এসব কার্যকর হওয়ার আগেই পুরোনো এককক্ষবিশিষ্ট সংসদ ও বর্তমান ৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এগিয়েছে। আইনগতভাবে বর্তমান বিধান চালু—এটি সত্য। আবার গণভোটে অনুমোদিত ভবিষ্যৎ কাঠামোর আগে এমন নির্বাচন নতুন ব্যবস্থাকে কতটা পূর্বনির্ধারিত করে ফেলছে, সেটিও বৈধ রাজনৈতিক প্রশ্ন। সরকারের উচিত বর্তমান রাষ্ট্রপতি-পদ থেকে সংস্কারকৃত পদে রূপান্তরের নিয়ম ও সময়সীমা স্পষ্ট করা।
স্বাধীন প্রতিষ্ঠান কি সত্যিই স্বাধীন হবে?
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ আইনের খসড়ায় কিছু ইতিবাচক ধারা আছে। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ যে ঝুঁকিগুলো দেখিয়েছে, সেগুলো সাধারণ ভাষায় বললে এমন: কমিশনের নিয়োগে সরকারই যদি নির্ধারক থাকে, কার্যালয় ও জনবল বাড়াতে সরকারের অনুমতি লাগে এবং বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগে কমিশনকে সেই বাহিনী বা সরকারের রিপোর্টের ওপর নির্ভর করতে হয়, তাহলে কাগজে স্বাধীন লেখা থাকলেও কাজে স্বাধীনতা দুর্বল হতে পারে।
গুম তদন্তের প্রশ্নটি আরও সরাসরি। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে পুলিশ, র্যাব, ডিবি ও সিটিটিসিকে প্রধান অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রাখা হয়েছে। সেই বাস্তবতায় তদন্তের কেন্দ্রীয় দায়িত্ব পুলিশকে দিলে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়—কারণ কোনো প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে একই প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলের ভেতর নিরপেক্ষ তদন্তে মানুষের আস্থা কমে। সমাধান পুলিশকে অপমান করা নয়; বরং বাহিনীনিরপেক্ষ তদন্ত সংস্থা, সাক্ষী সুরক্ষা এবং আদালতের কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করা।
নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশ: সরকারি দাবি, নাগরিক অভিজ্ঞতা
সরকার বলছে আইনশৃঙ্খলায় দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। সেই দাবি যাচাই করতে নিয়মিত ও তুলনাযোগ্য সরকারি তথ্য দরকার। একই সময়ে TIB প্রথম ১০০ দিনের পর্যালোচনায় হত্যা, ছিনতাই, অপহরণ, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মব-সহিংসতার উদ্বেগজনক তথ্য দিয়েছে। Human Rights Watch সরকার-সমালোচনামূলক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টকে কেন্দ্র করে অন্তত চারজনের গ্রেপ্তারের ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে। এই উৎসগুলোর সময়সীমা ও পদ্ধতি এক নয়, তাই সংখ্যা জোড়া দিয়ে অতিরঞ্জিত সিদ্ধান্ত টানা ঠিক হবে না। কিন্তু মাসভিত্তিক অপরাধ, মামলা, তদন্ত ও বিচারের উন্মুক্ত ড্যাশবোর্ড ছাড়া ‘উন্নতি’ বা ‘অবনতি’—কোনোটিই নাগরিকের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়।
জুলাইয়ের মানুষ শুধু সরকার বদল চায়নি; এমন একটি রাষ্ট্র চেয়েছিল যেখানে কার্টুন, ব্যঙ্গ, প্রশ্ন বা শান্তিপূর্ণ সমালোচনার উত্তর গ্রেপ্তার নয়। নতুন সরকার যদি পুরোনো আইনের বিস্তৃত ধারা ব্যবহার করে সমালোচনাকে অপরাধে পরিণত হতে দেয়, তবে বদলাবে শুধু ক্ষমতার মালিক—রাষ্ট্রের আচরণ নয়। স্বাধীন পুলিশ কমিশন, অধিকারসম্মত সাইবার আইন এবং রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে আইন প্রয়োগ তাই সংস্কারের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা।
অর্থনীতি ও প্রবাসী নীতিতে সূচনা আছে, এখন দরকার ফল
জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি কমা স্বস্তির, তবে ৮.৩২ শতাংশ এখনও পরিবারের বাজার, ভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয়ে বড় চাপ। একটি মাসের উন্নতি ধারাবাহিক প্রবণতা কি না, তা পরের কয়েক মাসের তথ্য বলবে। একইভাবে প্রবাসী কার্ড একটি প্রয়োজনীয় স্বীকৃতি, কিন্তু কার্ডই পূর্ণাঙ্গ প্রবাসনীতি নয়। বিদেশে যাওয়ার আগে চাকরি ও চুক্তি যাচাই, নিয়োগ ব্যয়ের সীমা, দূতাবাসে জরুরি সহায়তা, অনলাইন অভিযোগ, ফেরত আসা কর্মীর পুনর্বাসন এবং প্রবাসী বিনিয়োগ বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি—এসব সেবা বাস্তবে না এলে প্রতীকের সঙ্গে জীবনের দূরত্ব থেকেই যাবে।
পরবর্তী ১৮০ দিনে যে কাজগুলো মাপা যাবে
- জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ধাপ, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ও শেষ তারিখসহ পূর্ণ সময়সূচি প্রকাশ।
- সংবিধান সংস্কার পরিষদ কার্যকর না করার রাজনৈতিক ও আইনি কারণ লিখিতভাবে ব্যাখ্যা এবং বিকল্প প্রক্রিয়ায় বাধ্যতামূলক জনপরামর্শ।
- দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, ৭০ অনুচ্ছেদ ও সংস্কারকৃত রাষ্ট্রপতি-পদে রূপান্তরের স্পষ্ট রোডম্যাপ।
- মানবাধিকার কমিশনের নিয়োগে সরকারি প্রাধান্য কমিয়ে বহুপক্ষীয়, স্বচ্ছ ও স্বাধীন বাছাই।
- গুমের অভিযোগ তদন্তে পুলিশ-নির্ভরতার বদলে স্বাধীন, বাহিনীনিরপেক্ষ ব্যবস্থা এবং অভিযোগকারী ও সাক্ষীর সুরক্ষা।
- স্বাধীন পুলিশ কমিশনের নির্দিষ্ট তারিখ এবং হত্যা, অপহরণ, মব, চাঁদাবাজি ও মামলার অগ্রগতির মাসিক প্রকাশ।
- মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদধারীদের সম্পদ ও আর্থিক স্বার্থ প্রকাশ; প্রতি ৯০ দিনে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উন্মুক্ত অগ্রগতি প্রতিবেদন।
- প্রবাসী কর্মী ও বিনিয়োগকারীদের জন্য পরিমাপযোগ্য সেবামান, অভিযোগ নিষ্পত্তির সময়সীমা এবং সংগঠিত প্রবাসী প্ল্যাটফর্মের নিয়মিত অংশগ্রহণ।
সরকারের সামনে এখনও সময় ও সুযোগ আছে। নির্বাচিত ম্যান্ডেট তার সবচেয়ে বড় শক্তি; সেই ম্যান্ডেটকে নিজের ক্ষমতা সীমিত করার সাহসে রূপ দেওয়া হবে তার সবচেয়ে বড় সাফল্য। দ্বিতীয় ১৮০ দিন তাই আত্মপক্ষসমর্থনের সময় নয়—তারিখ, আইন, প্রতিষ্ঠান ও প্রকাশ্য ফল দিয়ে দেখানোর সময় যে জুলাইয়ের রাষ্ট্রসংস্কার শুধু বক্তৃতায় নয়, রাষ্ট্রের ভেতরেও প্রবেশ করছে।
তথ্যসূত্র
- NCP Diaspora Alliance Germany: সরকারের প্রথম ১৮০ দিন—গণভোটের ম্যান্ডেট, রাষ্ট্র সংস্কার ও নাগরিক নিরাপত্তা (পূর্ণ প্রতিবেদন, ১৮ আগস্ট ২০২৬)
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা/নির্বাচন কমিশন: গণভোটের সংশোধিত ফল—২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের গেজেট—১৩ নভেম্বর ২০২৫
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: সংবিধান সংশোধনের বিশেষ কমিটি গঠন—১৩ জুলাই ২০২৬
- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ: মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ আইনের মন্ত্রিসভা-অনুমোদিত খসড়া নিয়ে উদ্বেগ—১২ আগস্ট ২০২৬
- গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন/বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: পুলিশ, র্যাব, ডিবি ও সিটিটিসির ভূমিকা—৫ জুন ২০২৫
- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ: সরকারের প্রথম ১০০ দিনের মূল্যায়ন—৭ জুন ২০২৬
- Human Rights Watch: সরকার-সমালোচনামূলক পোস্টকে কেন্দ্র করে চার গ্রেপ্তার—২৩ এপ্রিল ২০২৬
- বাংলাদেশ ব্যাংক/বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো: জুলাই ২০২৬ মূল্যস্ফীতি
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা/প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়: সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অর্জন বিষয়ে সরকারি অবস্থান—১৭ আগস্ট ২০২৬
