NCP Diaspora Alliance GermanyNCP Diaspora Alliance Germanyমূল ওয়েবসাইট →

শিক্ষা জবাবদিহি

মেয়েদের উপবৃত্তি ফিরতে পারে—আগে খরচ ও ফলাফলের হিসাবটি প্রকাশ হোক

সম্পাদকীয় ডেস্ক · ২৫ আগস্ট ২০২৬

মেয়েদের সার্বজনীন উপবৃত্তি ফেরাতে সরকার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়েছে। অতীতের সাফল্যকে সম্মান করেও নতুন নকশার খরচ, কভারেজ, শর্ত ও ফলাফল প্রকাশ কেন জরুরি।

জনস্বার্থ, নথি ও জবাবদিহির প্রতীকী সম্পাদকীয় চিত্র

NCP Diaspora Alliance Germany-এর সম্পাদনা–বিশ্লেষণ চিত্র; এটি কোনো বাস্তব ঘটনার ছবি নয়।

সরকার মেয়েশিক্ষার্থীদের জন্য ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত সার্বজনীন উপবৃত্তি আবার চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বলেছে। ২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের বৈঠকে দেওয়া এই নির্দেশটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি শিক্ষা-সহায়তার পরিসর বড় করার প্রশ্ন তুলেছে। কিন্তু ‘সার্বজনীন’ শব্দটি যত আকর্ষণীয়, ততই বড় তার বাজেট ও নকশার দায়।

সরকারের ঘোষণায় এখনো কোনো নতুন ভাতা অনুমোদন, বরাদ্দ বা বাস্তবায়ন-তারিখ নেই। বরং সম্ভাব্য ব্যয়, উপকারভোগীর সংখ্যা, বিতরণ-পদ্ধতি এবং প্রত্যাশিত সামাজিক ও শিক্ষাগত প্রভাব বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট প্রস্তাব তৈরির কথা বলা হয়েছে। তাই এই মুহূর্তের সৎ প্রশ্নটি কর্মসূচির বিরোধিতা নয়: সেই প্রস্তাবটি কি প্রকাশ্যে যাচাই করা যাবে?

এখনো সিদ্ধান্ত নয়, হিসাব তৈরির নির্দেশ

বাসসের পিএমও-ভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যয়, সংখ্যা, বাস্তবায়ন-পদ্ধতি ও প্রভাব বিশ্লেষণের নির্দেশ দিয়েছেন। একই বৈঠকে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে ছেলেদের উপবৃত্তি এবং স্কুলের মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচির দুটি পদ্ধতি দুই জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে চালুর কথাও আলোচনা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রী ড. এ এন এম এহসানুল হক মিলন ও শিক্ষা সচিব আবদুল খালেক বৈঠকে ছিলেন। অর্থাৎ এটি বর্তমান সরকারের সরাসরি নীতিগত উদ্যোগের প্রাথমিক ধাপ; চূড়ান্ত কর্মসূচি বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

এই সীমাটিই জবাবদিহির জায়গা তৈরি করে। প্রস্তাব তৈরির পর তা শুধু প্রশাসনিক সারসংক্ষেপে সীমাবদ্ধ থাকলে নাগরিক, শিক্ষক, অভিভাবক ও অর্থনীতিবিদ কেউই দেখতে পারবেন না—কতজন নতুনভাবে সহায়তা পাবেন, বর্তমান সহায়তার সঙ্গে কী বদলাবে, কিংবা ব্যয়টি কোন বাজেট থেকে আসবে। ঘোষণার সময় সরকার নিজেই যে চারটি প্রশ্ন তুলেছে, সেগুলোর উত্তর প্রকাশ করাই তাই তার নিজের প্রতিশ্রুতির সবচেয়ে স্বাভাবিক পরীক্ষা।

পুরোনো সাফল্য নতুন নকশার বিকল্প নয়

বাংলাদেশের নারী মাধ্যমিক উপবৃত্তির অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করার কারণ নেই। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০২১ সালের দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়নে পুরোনো নারী মাধ্যমিক উপবৃত্তি ও সহায়তা কর্মসূচির সঙ্গে গড়ে ২.৫ অতিরিক্ত বছর পড়াশোনা, মাধ্যমিক শেষ করার সম্ভাবনা ১০.২ শতাংশ-পয়েন্ট বৃদ্ধি এবং বিয়ের বয়স ১.৪ বছর পিছোনোর অনুমান পাওয়া যায়। এডিবি ওই মূল্যায়নকে অতীতের কর্মসূচির ফল হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

হিসাবটি পাশাপাশি রাখি: ওই প্রমাণটি মূলত মাধ্যমিক পর্যায়ের সহায়তার; আজকের নির্দেশটি ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত সার্বজনীন করার সম্ভাব্যতা নিয়ে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা, প্রতিষ্ঠান, ফি, ডিজিটাল অর্থপ্রদান, মূল্যস্ফীতি ও বিকল্প ব্যয়—সবই ভিন্ন হতে পারে। তাই অতীতের ইতিবাচক ফল নতুন প্রস্তাব পরীক্ষা করার কারণ, নতুন ফল নিশ্চিত ধরে নেওয়ার অনুমতি নয়।

সার্বজনীনতার অর্থটি আগে স্পষ্ট করা দরকার

সার্বজনীনতা কি সব মেয়েশিক্ষার্থীকে বোঝাবে, নাকি নির্দিষ্ট ধরনের প্রতিষ্ঠান ও পর্যায়কে? ভর্তি, উপস্থিতি, ফল, আয়, বৈবাহিক অবস্থা বা অন্য কোনো শর্ত থাকবে কি? প্রতিবন্ধী, দূরবর্তী এলাকার ও মাদ্রাসা-কারিগরি শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তি কীভাবে হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে কেউ সুবিধা থেকে বাদ পড়লে সেটি নিয়মের ফল, নাকি তথ্যের ভুল—তা বোঝা যাবে না।

সরকারের পক্ষে শক্ত যুক্তিটিও বিবেচ্য। নগদ সহায়তা শিক্ষার সরাসরি খরচ কমাতে পারে এবং পুরোনো কর্মসূচির মূল্যায়ন মেয়েদের শিক্ষায় বিনিয়োগের সুফল দেখিয়েছে। একই সঙ্গে সভায় পুষ্টি, নিরাপদ খাবার ও বিদ্যালয়ে টিকে থাকার কথাও এসেছে। কিন্তু ভালো উদ্দেশ্য বাছাইয়ের নিয়ম, অভিযোগ নিষ্পত্তি, সময়মতো অর্থপ্রদান ও শেখার ফলের বিকল্প নয়। সার্বজনীন হলে বাজেটের সুযোগ-ব্যয়ও প্রকাশ্য হওয়া দরকার; লক্ষ্যভিত্তিক হলে বাদ পড়ার ঝুঁকিও মাপা দরকার।

প্রস্তাব প্রকাশেই বোঝা যাবে প্রতিশ্রুতির মান

শিক্ষা-সহায়তার আস্থা আসে নকশা থেকে

মেয়েদের পড়াশোনায় রাষ্ট্রের সহায়তা কোনো দয়া নয়; এটি সমঅধিকার ও জনবিনিয়োগ। বর্তমান সরকার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দিয়ে অন্তত সেই বিনিয়োগের প্রয়োজন স্বীকার করেছে। এখন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাজ হলো প্রস্তাবটি প্রকাশ করা, তার অনুমান ও সীমাবদ্ধতা জানানো, এবং শুরু হলে ফল মাপার ব্যবস্থা আগে থেকেই নির্দিষ্ট করা। তাহলেই উপবৃত্তি কেবল জনপ্রিয় ঘোষণা নয়, প্রমাণ-ভিত্তিক শিক্ষা-নীতিতে পরিণত হবে।

তথ্যসূত্র

  1. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (পিএমও-ভিত্তিক): ‘PM directs feasibility study on reintroducing universal stipends for girls’—২৪ আগস্ট ২০২৬
  2. এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক: ‘The Female Secondary Stipend and Assistance Program in Bangladesh: What Did It Accomplish?’—ফেব্রুয়ারি ২০২১
  3. বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস): ‘বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৪’—সরকারি পরিসংখ্যান প্রকাশনা
  4. শিক্ষা মন্ত্রণালয়: ‘উচ্চ মাধ্যমিক উপবৃত্তি প্রকল্প’—লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তার প্রকাশ্য প্রকল্প-বিবরণ
  5. মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ: ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিগণ’—বর্তমান সরকার ও দপ্তর-দায়িত্বের সরকারি তালিকা