একজন বাংলাদেশি বিদেশ থেকে সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন, অথচ নিজের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বা পৌরসভার মেয়র বাছাই করতে পারেন না—এই অসংগতি আর কতদিন চলবে? যে রাষ্ট্র জাতীয় নির্বাচনে প্রবাসীর কাছে ব্যালট পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে, সেই রাষ্ট্র স্থানীয় নির্বাচনের বেলায় কেবল জটিলতা ও খরচের কথা বলে দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। প্রশ্নটি বিশেষ সুবিধার নয়; দেশের ভোটার তালিকায় থাকা একজন নাগরিকের অংশগ্রহণকে কার্যকর করার।
১৭ জুন ২০২৬ প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের স্থানীয় নির্বাচনে আপাতত পোস্টাল ব্যালট না রাখার সিদ্ধান্ত উঠে আসে। একই প্রতিবেদনের হিসাবে, জাতীয় নির্বাচনে ৭ লাখ ৬৭ হাজার ২৩৩ জন প্রবাসী পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেছিলেন এবং বিদেশ থেকে ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৩৭২টি ভোট দেওয়া হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা দেখায়, বিদেশ থেকে ভোট দেওয়ার একটি বাস্তব ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। এখন প্রয়োজন তার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে স্থানীয় নির্বাচনের উপযোগী করে গড়ে তোলা।
প্রবাসীর ঠিকানা বিদেশে, ভোটার পরিচয় দেশেই
ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯-এর ধারা ৮(৬) বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিকে তাঁর সর্বশেষ নির্বাচনী বা ভোটার এলাকা, অথবা নিজ বা পৈতৃক বসতবাড়ির এলাকার অধিবাসী হিসেবে গণ্য করার বিধান রেখেছে। অর্থাৎ বার্লিন, লন্ডন, রোম বা দুবাইয়ে থাকলেই বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর স্থানীয় নির্বাচনী সম্পর্ক মুছে যায় না। তবে ভোট দিতে হলে সংশ্লিষ্ট চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় নাম থাকতে হবে—শুধু নাগরিকত্ব বা পৈতৃক বাড়ি থাকাই যথেষ্ট নয়।
ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন ও উপজেলা পরিষদের আইন সংশ্লিষ্ট তালিকায় থাকা ভোটারকে ভোটের অধিকার দেয়। বিদেশে থাকা নিজে থেকে অযোগ্যতার কারণ নয়। বর্তমান বাধা হলো ভোট দেওয়ার পদ্ধতি: বিধিমালা মূলত নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি ধরে তৈরি। ফলে স্থানীয় এলাকার ভোটার হয়েও দূরদেশে থাকা মানুষটি বাস্তবে অংশ নিতে পারেন না।
সংসদ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যাবে না কেন?
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ২৭ অনুচ্ছেদে বিদেশে থাকা বাংলাদেশি ভোটারকে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থায় স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের Postal Vote BD ব্যবস্থায় নিবন্ধন, পরিচয় যাচাই, বিদেশের ডাক ঠিকানা, ব্যালট পাঠানো ও ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া রয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনের জন্য তাই একেবারে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে না।

স্থানীয় নির্বাচনে অবশ্য বাড়তি কাজ আছে। একজন ভোটার কোন ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন বা উপজেলার কোন ওয়ার্ডে নিবন্ধিত, কোন পদগুলোতে তিনি ভোট দিতে পারবেন এবং তাঁর ব্যালট কোন রিটার্নিং অফিসারের কাছে যাবে—এসব নির্ভুলভাবে মিলাতে হবে। সহজ ভাষায়, সঠিক মানুষের কাছে সঠিক এলাকার সঠিক ব্যালট পৌঁছাতে হবে। জাতীয় ব্যবস্থার সঙ্গে এই স্থানীয় তথ্য ও ব্যালট পাঠানোর সংযোগ যোগ করাই প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকারই প্রবাসী পরিবারের সবচেয়ে কাছের সরকার
দেশে থাকা পরিবারের রাস্তা, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা, জন্মনিবন্ধন, বাজার ও নাগরিক সেবার সঙ্গে স্থানীয় সরকারের সরাসরি সম্পর্ক। প্রবাসীর বাড়ি, জমি ও ভবিষ্যৎ বিনিয়োগও স্থানীয় সিদ্ধান্তে প্রভাবিত হয়। যাঁর সিদ্ধান্তের ফল একটি পরিবার প্রতিদিন ভোগ করে, তাঁকে বাছাইয়ের সুযোগ থেকে সেই পরিবারের প্রবাসী সদস্যকে বাস্তবে দূরে রাখা গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বকে দুর্বল করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় প্রায় ৩৫.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশের অর্থনীতিতে এই অবদান স্বীকৃতি পায়; রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বেলায় একই গুরুত্ব কোথায়? তবে ভোট টাকা পাঠানোর বিনিময়ে পাওয়া পুরস্কার নয়। যিনি রেমিট্যান্স পাঠান না, ভোটার হিসেবে তাঁর অধিকারও সমান। প্রবাসীকে পূর্ণ নাগরিক হিসেবে দেখার অর্থই হলো তাঁর রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে বৈদেশিক মুদ্রার হিসাবের বাইরে স্বীকৃতি দেওয়া।
খরচের হিসাব প্রকাশ করুন, অংশগ্রহণের পথও খুলুন
জটিলতা ও ব্যয় নির্বাচন পরিচালনার বাস্তব প্রশ্ন। কিন্তু কোনো ব্যবস্থার খরচ আছে বলেই সেটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত যথেষ্ট নয়। কত খরচ, কোন ধাপে সমস্যা, কীভাবে কমানো সম্ভব এবং কত সময় লাগবে—নির্বাচন কমিশনকে সেই হিসাব প্রকাশ করতে হবে। নাগরিকের অংশগ্রহণ বাদ দেওয়ার আগে বিকল্পগুলো পরীক্ষা করার দায়ও কমিশনের।
সব স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে চালু করা কঠিন হলে নির্ধারিত সময়সীমায় পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পরিকল্পনা করা যায়। কয়েকটি পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনে অভিজ্ঞতা নিয়ে ইউনিয়ন ও উপজেলায় বিস্তারের পথ তৈরি হতে পারে। সেই পরীক্ষার নিয়ম, কারা সুযোগ পাবেন, কেন তাঁদের নির্বাচন করা হচ্ছে এবং পরবর্তী সম্প্রসারণ কবে—সব প্রকাশ্য থাকতে হবে। পরীক্ষামূলক উদ্যোগ যেন অনির্দিষ্ট অপেক্ষার নতুন নাম না হয়।
আইন সংশোধনের পথ রয়েছে—দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রয়োজন
স্থানীয় সরকার আইনগুলো ভোটদান পদ্ধতি ও ব্যালট ব্যবস্থাপনা নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে বিধি তৈরির ক্ষমতা দেয়। সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে ডাকযোগে ভোটের বিধান যুক্ত করার একটি যুক্তিসংগত আইনগত পথ রয়েছে। তবে তার পরিধি আইনগতভাবে যাচাই করে নেওয়া দরকার। সবচেয়ে স্পষ্ট ও টেকসই সমাধান হলো মূল আইনগুলোতে বিদেশে থাকা নিবন্ধিত ভোটারের ডাকযোগে ভোটদানের বিধান যোগ করা এবং তার অধীনে বিস্তারিত নির্বাচন বিধিমালা প্রণয়ন করা।
মূল বিধানের বক্তব্য হতে পারে: সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ভোটার তালিকায় থাকা বাংলাদেশি বিদেশে অবস্থান করলে নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত পদ্ধতিতে ডাকযোগে ভোট দিতে পারবেন। এরপর কার্যপ্রণালিতে পরিচয় যাচাই, স্থানীয় এলাকা ও পদের সঙ্গে ভোটারকে মেলানো, ব্যালটের গোপনীয়তা, আন্তর্জাতিক ডাকের সময়সীমা, গণনা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির নিয়ম স্পষ্ট করতে হবে।
একজন যেন ডাকযোগে ভোট দিয়ে আবার কেন্দ্রে ভোট দিতে না পারেন, তার জন্য তালিকা সমন্বয় প্রয়োজন। পরিচয় যাচাইয়ের তথ্য ও ভোটের পছন্দ এমনভাবে আলাদা রাখতে হবে যাতে গোপনীয়তা অক্ষুণ্ন থাকে। প্রার্থী বা অনুমোদিত এজেন্টের উপস্থিতিতে যাচাই ও গণনা, বাতিল ব্যালটের নির্দিষ্ট কারণ এবং স্বাধীন নিরীক্ষাও জরুরি। অংশগ্রহণ বাড়ানো ও নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা—দুটি দায়িত্ব একসঙ্গেই পালন করতে হবে।
এখন যে সিদ্ধান্তগুলো চাই
- বিদেশ থেকে স্থানীয় নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা চালুর নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ রোডম্যাপ প্রকাশ।
- সরকার ও নির্বাচন কমিশনের যৌথ উদ্যোগে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালার সংশোধনী খসড়া প্রকাশ এবং উন্মুক্ত মতামত গ্রহণ।
- Postal Vote BD-এর সঙ্গে স্থানীয় ভোটার এলাকা, নির্বাচনী পদ ও রিটার্নিং অফিসারের তথ্য যুক্ত করার প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি।
- স্বচ্ছ বাছাইয়ের ভিত্তিতে পরীক্ষামূলক প্রয়োগ, ব্যয় ও ফলাফলের প্রকাশ্য মূল্যায়ন এবং পরবর্তী সম্প্রসারণের সময়সূচি।
- ভোটের গোপনীয়তা, দ্বৈত ভোট প্রতিরোধ, ডাকের সময়সীমা ও স্বাধীন নিরীক্ষার কার্যকর নিশ্চয়তা।
- প্রবাসী সংগঠন, নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে অর্থবহ পরামর্শ।
জাতীয় নির্বাচন একটি দরজা খুলেছে। স্থানীয় নির্বাচনে এসে সেই দরজা বন্ধ রাখার পক্ষে শুধু প্রশাসনিক অসুবিধার কথা যথেষ্ট নয়। সরকারের কাজ প্রয়োজনীয় আইনগত উদ্যোগ নেওয়া; নির্বাচন কমিশনের কাজ কার্যকর, বিশ্বাসযোগ্য ব্যবস্থার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। প্রবাসীর অংশগ্রহণকে প্রশংসার বক্তব্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না—এবার তা ব্যালটেও পৌঁছাতে হবে।
তথ্যসূত্র
- ভোটার তালিকা আইন, ২০০৯—ধারা ৮(৬)
- গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ—অনুচ্ছেদ ২৭: ডাকযোগে ভোট
- স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন—ভোটাধিকার ও নির্বাচন পরিচালনা
- স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) আইন, ২০০৯
- নির্বাচন কমিশন—প্রযুক্তিসহায়ক পোস্টাল ভোটের নির্দেশনা
- দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ১৭ জুন ২০২৬—স্থানীয় নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটের সিদ্ধান্ত ও জাতীয় নির্বাচনের হিসাব
- বাংলাদেশ ব্যাংক, ৩০ জুন ২০২৬—২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রবাসী আয়
- প্রচ্ছদের ছবি: বাংলাদেশ তথ্য অধিদফতর, Wikimedia Commons—১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
