গুমের মতো ভয়াবহ অপরাধ বন্ধ করতে সরকার নতুন একটি আইনের খসড়া করেছে। খসড়ায় গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। শুনতে আইনটিকে খুব কঠোর মনে হয়।
কিন্তু একটি আইন আসলে কতটা শক্তিশালী, সেটি শুধু শাস্তি দেখে বোঝা যায় না। আসল প্রশ্ন হলো—অপরাধের অভিযোগ কে গ্রহণ করবে, কে তদন্ত করবে, কে প্রমাণ সংগ্রহ করবে এবং তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানটি কতটা স্বাধীন থাকবে?
নতুন খসড়াটি পড়ার পর এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
সহজ একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক
ধরুন, একটি স্কুলের কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিযোগ—তাদের একজন শিক্ষক পরীক্ষার ফল পরিবর্তন করেছেন। এখন সেই অভিযোগ তদন্তের পুরো দায়িত্ব যদি ওই শিক্ষক অথবা তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকর্মীর হাতে দেওয়া হয়, তাহলে তদন্তটি কি বিশ্বাসযোগ্য হবে?
হতে পারে তাঁরা সৎভাবে তদন্ত করবেন। কিন্তু এখানে স্বার্থের দ্বন্দ্ব থেকে যায়। অভিযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তদন্তকারীর সম্পর্ক থাকলে সাধারণ মানুষ সেই তদন্তের ওপর সহজে আস্থা রাখতে পারে না।
গুমের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন সামনে আসে। বাংলাদেশে অতীতে পুলিশ, র্যাব, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠেছে। অথচ প্রস্তাবিত আইনে গুমের মামলা তদন্তের প্রধান দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে পুলিশকে।
এটাই এই আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
মৃত্যুদণ্ড থাকলেই আইন শক্তিশালী হয় না
অনেকে বলতে পারেন, “আইনে তো মৃত্যুদণ্ড রাখা হয়েছে। তাহলে সমস্যা কোথায়?” সমস্যা হলো—অপরাধ প্রমাণিত না হলে কোনো শাস্তিই কার্যকর হবে না।
একটি গুমের ঘটনা প্রমাণ করতে অনেক ধরনের তথ্য প্রয়োজন হতে পারে:
- কে ব্যক্তিটিকে তুলে নিয়েছিল;
- কোন গাড়ি ব্যবহার করা হয়েছিল;
- কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল;
- কোন কর্মকর্তা নির্দেশ দিয়েছিলেন;
- থানার বা বাহিনীর নথিতে কী লেখা হয়েছিল;
- CCTV ফুটেজ কোথায়;
- মোবাইল ও গাড়ির অবস্থানের তথ্য কী;
- কোনো গোপন আটককেন্দ্রে রাখা হয়েছিল কি না।
এই তথ্যগুলোর বড় অংশই পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা বা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কাছে থাকতে পারে। তাদেরই কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে এবং তারাই তদন্ত নিয়ন্ত্রণ করলে গুরুত্বপূর্ণ নথি বা আলামত গোপন হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
তাই কাগজে মৃত্যুদণ্ড লিখে দিলেই একটি আইন শক্তিশালী হয়ে যায় না। স্বাধীন তদন্ত ছাড়া কঠোর শাস্তি অনেক সময় শুধু কাগজেই থেকে যায়।
পুলিশ অভিযোগ না নিলে আদালতে যাওয়া যাবে—কিন্তু ততক্ষণে?
খসড়ায় বলা হয়েছে, পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ না করলে ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নালিশি মামলা করা যাবে। এটি একটি সুযোগ, কিন্তু গুমের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়।
কারণ একজন মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার প্রথমে থানায় গেল, পুলিশ অভিযোগ নিল না, তারপর আইনজীবী খুঁজে আদালতে গেল—এই প্রক্রিয়ায় কয়েক দিন চলে যেতে পারে।
এর মধ্যে:
- CCTV ফুটেজ মুছে যেতে পারে;
- গাড়ির চলাচলের তথ্য পরিবর্তন হতে পারে;
- আটক ব্যক্তিকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হতে পারে;
- হেফাজতের নথি তৈরি বা পরিবর্তন করা হতে পারে;
- গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের ভয় দেখানো হতে পারে।
গুমের অভিযোগকে তাই সাধারণ চুরি বা মারামারির মামলার মতো দেখলে হবে না। অভিযোগ আসার সঙ্গে সঙ্গে মানুষটিকে জীবিত উদ্ধারের জন্য জরুরি অনুসন্ধান শুরু করতে হবে।
মানবাধিকার কমিশনকে কেন বাদ দেওয়া হলো?
২০২৫ সালের অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ তদন্তে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা ছিল। কমিশন অভিযোগ তদন্ত করতে, তথ্য চাইতে এবং প্রয়োজনে আটককেন্দ্র পরিদর্শন করতে পারত। নতুন খসড়ায় সেই দায়িত্ব সরিয়ে পুলিশকে দেওয়া হচ্ছে।

এখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুক্তি হলো, প্রচলিত ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী পুলিশ তদন্ত করে। কিন্তু বিশেষ অপরাধের জন্য বিশেষ আইনে স্বাধীন তদন্তের ব্যবস্থা করা অসম্ভব নয়। প্রয়োজন হলে আলাদা তদন্ত ইউনিট গঠন করা যায়। মানবাধিকার কমিশন, বিচার বিভাগ এবং বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়েও তদন্ত দল হতে পারে।
বরং বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতার কারণে গুমের তদন্তে সাধারণ ব্যবস্থার চেয়ে বেশি স্বাধীনতা প্রয়োজন। অঘোষিত আটককেন্দ্র বা কথিত “আয়নাঘর” খুঁজে বের করতে হলে এমন একটি প্রতিষ্ঠান দরকার, যারা আগাম অনুমতি ছাড়াই যেকোনো সন্দেহজনক আটকস্থল পরিদর্শন করতে পারবে।
অভিযুক্ত বাহিনীর অনুমতি নিয়ে যদি আটককেন্দ্র দেখতে হয়, তাহলে গোপন আটককেন্দ্র কখনোই গোপন থাকবে না—পরিদর্শনের আগেই সব সরিয়ে ফেলা সম্ভব হবে।
সাদা পোশাকে তুলে নিলে দায় কার?
খসড়ায় সরকারি কর্মচারী, পুলিশ, সেনাবাহিনী, র্যাব, বিজিবি, কোস্টগার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা ও যৌথ বাহিনীর মাধ্যমে সংঘটিত গুমকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এটি ইতিবাচক।
কিন্তু বাস্তবে অনেক সময় কাউকে সাদা পোশাকে তুলে নেওয়া হয়। যারা নিয়ে যায়, তারা নিজেদের পরিচয় দেয় না। কোনো সরকারি গাড়িও ব্যবহার করে না। পরে সংশ্লিষ্ট বাহিনী বলে, “আমরা তাকে আটক করিনি।” তখন পরিবার কীভাবে প্রমাণ করবে যে ঘটনার পেছনে রাষ্ট্রীয় কোনো সংস্থার সমর্থন বা নির্দেশ ছিল?
কোনো বাহিনী যদি রাজনৈতিক কর্মী, সোর্স, অবসরপ্রাপ্ত সদস্য বা বেসরকারি লোকজনকে ব্যবহার করে, তাদের ক্ষেত্রে কী হবে? আইনে পরিষ্কারভাবে থাকতে হবে—রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ নির্দেশের পাশাপাশি রাষ্ট্রের পরোক্ষ সমর্থন, নীরব সম্মতি অথবা রাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করাও এই অপরাধের মধ্যে পড়বে।
অন্যথায় ইউনিফর্ম ও সরকারি গাড়ি ব্যবহার না করেই আইনের সংজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কি সহজেই দায় এড়াতে পারবেন?
গুমের মতো অপরাধ সাধারণত একজন নিচের পর্যায়ের সদস্যের একক সিদ্ধান্তে ঘটে না। কাউকে তুলে নেওয়া, গাড়ি ব্যবহার করা, জিজ্ঞাসাবাদ করা, গোপন স্থানে রাখা এবং পুরো ঘটনা অস্বীকার করার পেছনে একটি নির্দেশনার কাঠামো থাকতে পারে।
খসড়ায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দায়ের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু শুধু তিনি সরাসরি জানতেন বা নির্দেশ দিয়েছিলেন—এটি প্রমাণ করার শর্ত থাকলে সমস্যা হবে। কারণ এ ধরনের নির্দেশ সাধারণত লিখিতভাবে দেওয়া হয় না। কোনো কর্মকর্তা কাগজে লিখবেন না—“এই ব্যক্তিকে গুম করো।”
তাই আইনে শুধু “তিনি জানতেন” বললে হবে না। বলতে হবে:
- তিনি জানতেন;
- তাঁর জানা উচিত ছিল;
- অভিযোগ বা তথ্য পাওয়ার পরও ব্যবস্থা নেননি;
- অপরাধ বন্ধ বা তদন্ত করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সেটি করেননি।
নইলে সব দায় নিচের পর্যায়ের কয়েকজন সদস্যের ওপর চাপিয়ে ঊর্ধ্বতন নির্দেশদাতারা রক্ষা পেতে পারেন।
গোপন আটককেন্দ্র তৈরি ও আলামত নষ্টের শাস্তি কেন কমবে?
আগের অধ্যাদেশে গুমের আলামত নষ্ট এবং গোপন আটককেন্দ্র তৈরির ন্যূনতম শাস্তি সাত বছর ছিল। নতুন খসড়ায় সেটি পাঁচ বছর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি বোঝা কঠিন।
গোপন আটককেন্দ্র তৈরি করা কোনো ছোট অপরাধ নয়। এ ধরনের জায়গা ছাড়া পরিকল্পিতভাবে মানুষকে লুকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। একইভাবে CCTV ফুটেজ মুছে ফেলা, গাড়ির তথ্য পরিবর্তন করা, হেফাজতের নথি নষ্ট করা বা লাশ সরিয়ে ফেলা মূল অপরাধকে আড়াল করার অংশ।
তাহলে এসব অপরাধের শাস্তি কমানোর প্রয়োজন কেন? গুমের শাস্তি কঠোর রেখে গুমের প্রমাণ নষ্ট করার শাস্তি কমিয়ে দিলে অপরাধীদের জন্য একটি ভুল বার্তা যেতে পারে।
পাঁচ বছর অপেক্ষা করার যুক্তি কী?
খসড়ায় বলা হয়েছে, গুমের পাঁচ বছর পরও কোনো ব্যক্তির সন্ধান না পাওয়া গেলে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন হতে পারে। কিন্তু একজন মানুষকে বেআইনিভাবে তুলে নিয়ে তার অবস্থান অস্বীকার করাই গুম। অপরাধটি গুরুতর হওয়ার জন্য পাঁচ বছর অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।
পাঁচ বছরের সময়সীমা পরিবারের সম্পত্তি, উত্তরাধিকার বা নিখোঁজ ব্যক্তির আইনি অবস্থান ঠিক করার জন্য প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু অপরাধের গুরুত্ব নির্ধারণে এই সময়সীমা ব্যবহার করা যুক্তিসংগত নয়।
একটি পরিবার পাঁচ দিন ধরে জানে না তাদের প্রিয় মানুষটি কোথায়—সেটিও ভয়াবহ অপরাধ। পাঁচ বছর পর সেটি হঠাৎ করে নতুন অপরাধে পরিণত হয় না।
পুরোনো গুমের বিচার কীভাবে হবে?
আইনে গুমকে চলমান অপরাধ বলা হয়েছে। অর্থাৎ নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানা না যাওয়া পর্যন্ত অপরাধটি চলতে থাকবে। এটি গুরুত্বপূর্ণ। তবে এখানে আরেকটি প্রশ্ন আছে।

যারা এখনো নিখোঁজ, তাদের ক্ষেত্রে নতুন আইন প্রয়োগ করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। কিন্তু যারা কয়েক বছর আগে ফিরে এসেছেন অথবা যাদের লাশ পাওয়া গেছে, তাদের মামলার বিচার কোন আইনে হবে?
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী কোনো কাজ সংঘটনের সময় যে শাস্তি ছিল না, পরে নতুন আইন করে সেই শাস্তি সাধারণভাবে প্রয়োগ করা যায় না। তাই পুরোনো ঘটনাগুলোকে স্পষ্টভাবে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা প্রয়োজন:
- এখনো নিখোঁজ;
- ফিরে এসেছেন;
- লাশ পাওয়া গেছে;
- অন্য মামলায় ঘটনা তদন্তাধীন;
- ব্যাপক বা পরিকল্পিত গুম হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আওতায় পড়ে।
এগুলো পরিষ্কার না করলে পুরোনো অপরাধীরা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। আবার ভুলভাবে প্রয়োগ করলে মামলাগুলো সাংবিধানিক জটিলতায় আটকে যেতে পারে।
পরিবারের সুরক্ষা কোথায়?
গুমের শিকার শুধু নিখোঁজ ব্যক্তি নন। তাঁর বাবা-মা, স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান এবং পরিবারের অন্য সদস্যরাও দীর্ঘদিন ধরে মানসিক, সামাজিক ও আর্থিক কষ্টের মধ্যে থাকেন।
অনেক পরিবার জানে না তাদের প্রিয় মানুষটি জীবিত, নাকি মৃত। ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তি, সন্তানের খরচ এবং পারিবারিক সিদ্ধান্ত—সবকিছু অনিশ্চয়তায় আটকে যায়।
তাই শুধু অপরাধীর শাস্তি দিলেই প্রতিকার সম্পূর্ণ হয় না। পরিবারকে দিতে হবে:
- দ্রুত আর্থিক সহায়তা;
- আইনি সহায়তা;
- মানসিক স্বাস্থ্যসেবা;
- সাক্ষী ও অভিযোগকারীর নিরাপত্তা;
- সন্তানের শিক্ষা ও চিকিৎসায় সহায়তা;
- নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়ার বিষয়ে নিয়মিত তথ্য।
অপরাধীর বিচার শেষ হওয়ার জন্য পরিবারকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করানো উচিত নয়।
মিথ্যা অভিযোগের আইন যেন পরিবারকে ভয় না দেখায়
ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য তৈরি করে কাউকে ফাঁসানো অবশ্যই অপরাধ হওয়া উচিত। কিন্তু “অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি” এবং “অভিযোগটি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা ছিল”—এই দুটি এক বিষয় নয়।
গুমের ঘটনায় প্রমাণ সংগ্রহ করা স্বাভাবিকভাবেই কঠিন। পুলিশ পর্যাপ্ত প্রমাণ না পেলে অথবা মামলা আদালতে প্রমাণিত না হলে অভিযোগকারী পরিবারকে মিথ্যা মামলার আসামি করা যাবে না। অন্যথায় অনেক পরিবার অভিযোগ করতেই ভয় পাবে।
তাহলে সমাধান কী?
আইনটি বাতিল করা নয়; বরং কার্যকরভাবে সংশোধন করা প্রয়োজন। সবচেয়ে জরুরি কয়েকটি ব্যবস্থা হতে পারে:
- পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে স্বাধীন গুম তদন্ত ইউনিট গঠন।
- জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে নিজ উদ্যোগে তদন্ত এবং যেকোনো আটককেন্দ্র পরিদর্শনের ক্ষমতা দেওয়া।
- অভিযোগ পাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জরুরি অনুসন্ধান শুরু করা।
- যে বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, সেই বাহিনীর কাউকে তদন্তে না রাখা।
- ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ‘জানা উচিত ছিল’ এমন ঘটনাতেও দায় নির্ধারণ করা।
- প্রতিটি গ্রেপ্তার ও আটকের সময়, স্থান, গাড়ি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও স্থানান্তরের তথ্য কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারে রাখা।
- CCTV, গাড়ির GPS, মোবাইল তথ্য ও হেফাজতের নথি সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা।
- অভিযোগকারী, পরিবার, আইনজীবী ও সাক্ষীদের জন্য স্বাধীন নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করা।
- অপরাধী শনাক্ত হওয়ার আগেই ভুক্তভোগী পরিবারকে রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে সহায়তা দেওয়া।
- প্রতি বছর কত অভিযোগ এসেছে, কতজন উদ্ধার হয়েছেন, কত মামলা হয়েছে এবং কত কর্মকর্তা অভিযুক্ত—এসব তথ্য প্রকাশ করা।
শেষ কথা
গুম বন্ধ করতে কঠোর আইন প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন স্বাধীন তদন্ত ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি। যে প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে পারে, সেই প্রতিষ্ঠানের হাতেই যদি অভিযোগ গ্রহণ, প্রমাণ সংগ্রহ এবং তদন্তের পুরো দায়িত্ব থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন থাকবেই।
একটি ভালো আইন শুধু অপরাধীর বড় শাস্তির কথা বলে না। একটি ভালো আইন এমন ব্যবস্থা তৈরি করে, যাতে ক্ষমতাবান ব্যক্তিও প্রমাণ লুকাতে না পারে, তদন্তে প্রভাব ফেলতে না পারে এবং পদ বা পরিচয় ব্যবহার করে দায় এড়াতে না পারে।
সুতরাং মূল প্রশ্ন মৃত্যুদণ্ড থাকবে কি থাকবে না—শুধু সেটি নয়।
এই প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত প্রস্তাবিত আইনকে গুম প্রতিরোধের পূর্ণাঙ্গ আইন বলা কঠিন।
তথ্যসূত্র
- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬-এর খসড়া
- প্রথম আলো: প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ আইন নিয়ে প্রতিবেদন
- বাংলাদেশ আইন: গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ ২০২৫
- OHCHR: গুম থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশন
- Human Rights Watch: Bangladesh—First Enforced Disappearance Case Since July 2024 Uprising
