২৭ আগস্ট সংসদে ওঠা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়; শাস্তি, ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও নিখোঁজ ব্যক্তিকে খোঁজার ব্যবস্থাও প্রস্তাব করেছে। এটি প্রয়োজনীয় অগ্রগতি। কিন্তু আইনের কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত সাজা কত কঠোর, সেই প্রশ্নে থামবে না। আসল প্রশ্ন হলো—অভিযোগ উঠলে প্রমাণ সংগ্রহ ও তদন্তের কর্তৃত্ব কার হাতে থাকবে?
বাসসের সংসদ-প্রতিবেদন বলছে, প্রস্তাবিত আইনে কোনো স্বাধীন তদন্তকারী সংস্থা গঠনের কথা নেই; তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপরই থাকবে। গুমের অভিযোগে যখন আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা সংস্থার সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠতে পারে, তখন এই নকশাটি শুধু প্রক্রিয়াগত বিষয় নয়—পরিবারের সত্য জানার অধিকার, সাক্ষীর নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ জবাবদিহির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন।
আইন এখনো পাস হয়নি—সংশোধনের সুযোগ এখানেই
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি উত্থাপন করেছেন; ডেপুটি স্পিকার সেটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠিয়ে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন চেয়েছেন। তাই এটি এখনো আইন নয়। সংসদীয় কমিটির কাজ কেবল ভাষা ঠিক করা নয়; প্রস্তাবিত কাঠামোটি ভুক্তভোগী, সাক্ষী ও তদন্তের বাস্তবতায় কাজ করবে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা।
এই পর্যায়ে একটি ন্যায্য পার্থক্য জরুরি। বিলটিকে এমনভাবে সমালোচনা করা ঠিক নয় যেন এতে কোনো সুরক্ষা নেই; আবার কঠোর শাস্তির কথা বলে তদন্তের নকশা এড়িয়ে যাওয়াও ঠিক নয়। দুই বিষয়ই একসঙ্গে বিচার করতে হবে।
যে সুরক্ষাগুলো রাখা হয়েছে, সেগুলো বাস্তব
সংসদে উত্থাপিত বিলের বর্ণনায় গুমকে আমলযোগ্য, অজামিনযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ করার কথা আছে। কোনো ভুক্তভোগী মারা গেলে বা পাঁচ বছরের বেশি সময় নিখোঁজ থাকলে মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে। আদালতকে তল্লাশি পরোয়ানা দেওয়ার ক্ষমতা, ডিজিটাল প্রমাণ গ্রহণ, সাক্ষী ও অভিযোগকারীর সুরক্ষা, বিশেষ তহবিল থেকে আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ—এসবও প্রস্তাবিত কাঠামোর অংশ।
সরকারের উদ্দেশ্যও প্রকাশ্য: মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আইনের শাসন রক্ষা করা। ভুক্তভোগী ও পরিবারের কাছে তদন্তের অগ্রগতি, ঘটনার সত্য এবং নিখোঁজ ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানার অধিকারের কথাও বলা হয়েছে। এই লক্ষ্য ও সুরক্ষাগুলোকে স্বাগত জানানো উচিত। ঠিক এ কারণেই তদন্তব্যবস্থার প্রশ্নে মানদণ্ড উঁচু হওয়া দরকার।
পুলিশি তদন্ত আর স্বাধীন তদন্ত এক জিনিস নয়
সাধারণ ফৌজদারি মামলায় পুলিশি তদন্ত স্বাভাবিক পথ। কিন্তু গুমের অভিযোগের চরিত্র আলাদা হতে পারে। তদন্তকারীকে আটকস্থলের নথি, গাড়ির চলাচল-রেকর্ড, ডিউটি তালিকা, যোগাযোগ বা ডিজিটাল প্রমাণ চাইতে হতে পারে; সাক্ষীকে এমন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও কথা বলতে হতে পারে যার ক্ষমতা ও তথ্যভান্ডার রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। এখানে কেবল তদন্তের ক্ষমতা লিখে দিলেই বাস্তব স্বাধীনতা তৈরি হয় না।
১৩ আগস্ট এনসিপি যে আপত্তি তুলেছিল, তার সারকথা এটিই: সম্ভাব্য অভিযুক্ত পুলিশ, সামরিক, গোয়েন্দা ও অন্য নিরাপত্তা বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের বাইরে তদন্তের ব্যবস্থা দরকার। এটি দলের রাজনৈতিক দাবি—কোনো প্রমাণিত অভিযোগের রায় নয়। কিন্তু একই উদ্বেগ মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও গুম-তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্যদের আলোচনাতেও এসেছে।
২০২৫ সালের কাঠামো থেকে কী হারানোর ঝুঁকি?
সরকারি গেজেটের তালিকায় ১ ডিসেম্বর ২০২৫-এর গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশটি ২০২৫ সালের ৭৩ নম্বর অধ্যাদেশ হিসেবে আছে। সে সময়ের প্রকাশিত নথি ও আইন-পর্যালোচনায় গুমের অভিযোগে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের ব্যবস্থার কথা ছিল। পরে সংসদের অনুমোদন না পাওয়ায় সেই অধ্যাদেশের কার্যকারিতা শেষ হয়।
এই তুলনার অর্থ পুরোনো অধ্যাদেশটি নিখুঁত ছিল—এ কথা বলা নয়। স্বাধীন কমিশনেরও দক্ষতা, বাজেট, তল্লাশি ও নথি-তলবের বাস্তব ক্ষমতা দরকার। তবে নতুন বিলে পুলিশি তদন্তের পথে যাওয়ার কারণ, বিকল্প সুরক্ষা এবং বাহিনীগুলোর কাছ থেকে প্রমাণ আদায়ের ব্যবস্থা সরকারকে স্পষ্ট করা দরকার। এখন পর্যন্ত পর্যালোচিত সরকারি প্রকাশনা ও সংসদ-প্রতিবেদনে সেই স্বাধীনতার প্রশ্নের আলাদা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
পরিবারের অভিযোগকে ভয়মুক্ত রাখাও তদন্তের অংশ
বিলে মিথ্যা অভিযোগের জন্য পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের প্রস্তাবের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। ইচ্ছাকৃত ও বিদ্বেষপ্রসূত মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা থাকা অযৌক্তিক নয়। কিন্তু ‘অভিযোগ প্রমাণ করা যায়নি’ আর ‘পরিবার জেনেশুনে মিথ্যা বলেছে’ এক কথা নয়। গুমের ঘটনায় অনেক প্রমাণ সম্ভাব্য অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রীয় নথির নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। তাই সংসদকে স্পষ্ট করতে হবে—শাস্তির আগে ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচারের শক্ত প্রমাণ লাগবে, এবং সৎ বিশ্বাসে করা অভিযোগের জন্য পরিবারের ওপর প্রতিশোধমূলক চাপ পড়বে না।
এক দিনের পরামর্শে এমন আইন শক্ত হয় না
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২৭ জুলাই খসড়া প্রকাশ করে ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে মতামত চেয়েছিল। টিআইবি একে কার্যত এক দিনের পরামর্শের সুযোগ বলে সমালোচনা করে অন্তত দুই সপ্তাহ সময় এবং ভুক্তভোগী পরিবারসহ অংশীজনের অর্থবহ অংশগ্রহণ চেয়েছিল। ১২ আগস্ট টিআইবি আবার বলেছে, মন্ত্রিসভা অনুমোদিত খসড়ায় অংশীজনের মৌলিক উদ্বেগ যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। এমন গুরুতর আইন দ্রুত পাসের লক্ষ্য নয়, যুক্তিসংগত শুনানি ও জবাবসহ পাস হওয়াই সরকারের শক্তি হতে পারে।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের পরীক্ষাও এটি
বাংলাদেশ ৩০ আগস্ট ২০২৪ গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে যোগ দেয়। সনদের ১২ অনুচ্ছেদে অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে বিলম্ব ছাড়া পূর্ণাঙ্গ, নিরপেক্ষ তদন্তের কথা বলা হয়েছে; অভিযোগকারী, সাক্ষী ও পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি বা প্রতিশোধ থেকে সুরক্ষার কথাও আছে। জাতিসংঘের গুমবিষয়ক কমিটি বিভিন্ন দেশের ক্ষেত্রে বলেছে, অভিযুক্ত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের তদন্তে অংশ নেওয়া বা তদন্তকে প্রভাবিত করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।
- সব নিরাপত্তা বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের বাইরে বিশেষায়িত, আইনগত ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত ইউনিট বা স্বাধীন সংস্থা গঠন করা।
- তদন্তকারীকে নথি তলব, ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণ, প্রাসঙ্গিক আটকস্থান পরিদর্শন ও কর্মকর্তাকে হাজির করার বাস্তব ক্ষমতা দেওয়া।
- পরিবারের সরাসরি, অনলাইন ও ডাকযোগে সেই স্বাধীন ব্যবস্থায় অভিযোগের পথ রাখা এবং নিয়মিত অগ্রগতি জানানো।
- সৎ বিশ্বাসে করা অভিযোগকে সুরক্ষা দেওয়া; ‘প্রমাণিত হয়নি’কে ‘ইচ্ছাকৃত মিথ্যা’ না ধরে কঠোর প্রমাণের মানদণ্ড রাখা।
- অভিযুক্ত কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠান যাতে সাক্ষী, নথি বা তদন্তের গতিপথে প্রভাব ফেলতে না পারে, তার স্পষ্ট অস্থায়ী সুরক্ষা-ব্যবস্থা রাখা।
শেষ কথা: রাষ্ট্রকে সত্য গোপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করাই আইনের কাজ
গুমের বিরুদ্ধে আইন অবশ্যই হওয়া উচিত। সংসদে ওঠা বিলের স্বতন্ত্র অপরাধের স্বীকৃতি, শাস্তি, আদালতের তল্লাশি-ক্ষমতা, ক্ষতিপূরণ ও পরিবারকে তথ্য দেওয়ার প্রস্তাব—এসব রক্ষা করা জরুরি। কিন্তু ন্যায়বিচারের দরজায় প্রথম প্রশ্নটি থাকবে: তদন্ত কে করবে এবং তার কাছে প্রমাণ আদায়ের বাস্তব ক্ষমতা আছে কি না।
আমাদের বিবেচনায়, সংসদীয় কমিটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন হওয়া উচিত স্বাধীন তদন্তের নিশ্চয়তা। একটি শক্ত আইন কেবল অপরাধের নাম ও শাস্তি লেখে না; এমন ব্যবস্থাও তৈরি করে যাতে কোনো সংস্থা, কোনো কর্মকর্তা বা কোনো ভবিষ্যৎ সরকার একজন মানুষকে অস্বীকার করে সত্যটিকে চিরতরে আটকে রাখতে না পারে।
তথ্যসূত্র
- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬-এর সরকারি খসড়া—২৭ জুলাই ২০২৬
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: সংসদে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপন—২৭ আগস্ট ২০২৬
- সরকারি মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদপ্তর: গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫ (অধ্যাদেশ নং ৭৩)—১ ডিসেম্বর ২০২৫
- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ: এক দিনের পরামর্শকে ‘mockery’ বলার বিবৃতি—২৯ জুলাই ২০২৬
- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ: মন্ত্রিসভা-অনুমোদিত খসড়ায় জবাবদিহির ঘাটতি নিয়ে বিবৃতি—১২ আগস্ট ২০২৬
- জাতিসংঘ চুক্তি সংগ্রহ: বাংলাদেশ ৩০ আগস্ট ২০২৪ গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে যোগ দেয়
- জাতিসংঘ: গুমবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের ১২ অনুচ্ছেদ—অভিযোগ, নিরপেক্ষ তদন্ত ও সুরক্ষা
- বাংলা ট্রিবিউন: খসড়ায় পুলিশি তদন্ত নিয়ে আইনজীবী ও অধিকারকর্মীদের প্রশ্ন—১১ জুলাই ২০২৬
