গুমকে আলাদা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকার করে, শাস্তি ও প্রতিকারের পথ রেখে জাতীয় সংসদ ৬ সেপ্টেম্বর গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬ পাস করেছে। একই দিনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলও পাস হয়েছে। এটি এমন একটি বিষয়ে আইন করার অগ্রগতি, যেখানে দীর্ঘদিনের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জন্য রাষ্ট্রের উত্তর ছিল অসম্পূর্ণ। কিন্তু আইনটির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি শাস্তির অঙ্ক নয়। অভিযোগ যদি রাষ্ট্রের কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধেই হয়, তদন্তটি কার নিয়ন্ত্রণে হবে এবং কে তাকে জবাবদিহির মধ্যে রাখবে?
আগের কমিটি-পর্বের লেখার এটি অনুসরণী প্রতিবেদন। তখন প্রশ্ন ছিল প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে। এখন নতুন ঘটনা হলো সংসদে পাস হওয়া। সরকারি মুদ্রণালয়ের সূচিতে ২৭ আগস্টের বিল নং ১০৬ ও ১০৭ হিসেবে দুটি বিলের অস্তিত্ব আছে, আর বাসসের ৬ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন পাসের ঘটনা ও সরকারের ব্যাখ্যা নিশ্চিত করেছে। ফলে আজকের প্রশ্ন আইন দরকার কি না নয়; প্রশ্ন হলো, পাস হওয়া কাঠামোটি ভুক্তভোগীর সত্য জানার অধিকারকে কতটা বাস্তব সুরক্ষা দেয়।
পাস হওয়া বিল: কী নিশ্চিত, কী এখনো যাচাই দরকার
বাসস বলেছে, পাস হওয়া গুমবিরোধী বিলে গুম একটি আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য অপরাধ। সরকারি বিবরণে বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী বা সশস্ত্র/শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ক্ষমতার বলে, বা তাদের অনুমোদন-সমর্থন-সম্মতিতে কাউকে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করে পরে তা অস্বীকার বা তার অবস্থান গোপন করলে সেটি গুমের সংজ্ঞার মধ্যে পড়বে। আইনটি নিখোঁজ ব্যক্তিকে খোঁজা, মামলা, পরিবার ও ভুক্তভোগীর সুরক্ষা এবং জাতীয় তথ্যভান্ডারের কাঠামোর কথাও বলে।
শাস্তির ভাষাও কঠোর। বাসসের মতে, সাধারণ গুমের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ভুক্তভোগী মারা গেলে বা পাঁচ বছরেও তার সন্ধান না মিললে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবনের সঙ্গে সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা জরিমানার বিধান আছে। দ্য ডেইলি স্টার পাস হওয়া বিলের বিবরণে বলেছে, তদন্ত ১২০ দিনের মধ্যে এবং বিচার পরের ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ধরনের সময়সীমা ও তথ্যভান্ডার পরিবারের দীর্ঘ অনিশ্চয়তা কমাতে সহায়ক হতে পারে, যদি এগুলো বাস্তবে মানা হয়।
একই সঙ্গে ভাষার সীমা বোঝা জরুরি। সংসদে পাস হওয়া বিল ও চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত আইনের পাঠ এক নয়। পরবর্তী সাংবিধানিক ও গেজেট-প্রক্রিয়ায় কোন সংশোধনী কোন ভাষায় থাকবে, সেটিই হবে নাগরিক, আইনজীবী ও আদালতের নির্ভর করার পাঠ। তাই এখনই সরকারকে সম্পূর্ণ চূড়ান্ত পাঠ, ধারা-পরিবর্তনের তালিকা এবং বাস্তবায়ন-বিধির সময়সূচি প্রকাশ করতে হবে। এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইন নিয়ে অপ্রয়োজনীয় অনুমান কমবে।
সরকারের সবচেয়ে শক্ত যুক্তি
সরকারের পক্ষে বলার মতো বাস্তব বিষয় আছে। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন মানবাধিকার কমিশনে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনার থাকবেন; অন্তত একজন নারী এবং একজন সংখ্যালঘু বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্য থাকার কথা বলা হয়েছে। কমিশন তাৎক্ষণিক ঝুঁকিতে অন্তর্বর্তী আদেশ দিতে পারবে এবং নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু ও গুম প্রতিরোধে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী প্রটোকলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংসদে বলেছেন, কমিশনকে শক্তিশালী করা হয়েছে এবং নির্বাচন কমিটির নেতৃত্ব স্পিকারের কাছে রাখাকে তিনি নিরপেক্ষতার ব্যবস্থা হিসেবে দেখেন। গুমের ক্ষেত্রে দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযোগ কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে হলে অভিযুক্ত বাহিনী নিজে তদন্ত করতে পারবে না; সরকার অন্য বাহিনী বা অভিযুক্ত বাহিনীকে বাদ দিয়ে আন্তঃবাহিনী দলকে দায়িত্ব দিতে পারবে। এটি শূন্যের চেয়ে ভালো সুরক্ষা। অভিযোগ সরাসরি অভিযুক্ত সংস্থার কাছে ফেরত না যাওয়ার একটি পথ এতে তৈরি হয়।
সরকারের এই যুক্তি তাই এক কথায় বাতিল করা যায় না। নতুন অপরাধের স্বীকৃতি, পরিবারের অধিকার, অন্তর্বর্তী সুরক্ষা, তথ্যভান্ডার এবং অভিযুক্ত বাহিনীকে নিজের তদন্ত থেকে বাদ দেওয়ার কথা—সবই সম্ভাব্য উন্নতি। ন্যায়সংগত মূল্যায়নে এগুলো স্বীকার করতেই হবে।
তবু স্বাধীনতার ঘাটতি কেন মূল প্রশ্ন
সমস্যাটি তদন্তের সাংগঠনিক নকশায়। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৫ সালের অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের গুম-অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা ছিল; পাস হওয়া বিলে সেই ক্ষমতা রাখা হয়নি। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন তদন্তের দায়িত্ব সাধারণত উপপরিদর্শক পদমর্যাদার নির্ধারিত তদন্ত কর্মকর্তার হাতে যাবে। অভিযুক্ত বাহিনী বাদ গেলেও তদন্তকারী অন্য বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী দল যদি নির্বাহী নিয়ন্ত্রণের একই কাঠামোর ভেতরে থাকে, তবে ভুক্তভোগীর চোখে সেটি স্বাধীন তদন্তের সমতুল্য হবে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
এটি কোনো বাহিনীর বিরুদ্ধে আগে থেকেই অপরাধ প্রমাণের দাবি নয়। বরং গুমের অভিযোগের ধরনই এমন যে সম্ভাব্য সাক্ষী, হেফাজতের নথি, যানবাহনের রেকর্ড, যোগাযোগের তথ্য ও আটকস্থলে প্রবেশাধিকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে থাকতে পারে। যে ব্যবস্থার কাছে এসব উপাদান রয়েছে, সেই ব্যবস্থার বাইরে দ্রুত ও নিরপেক্ষ প্রমাণ সংরক্ষণের ক্ষমতা না থাকলে তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল হয়। অভিযোগ মিথ্যা হলেও স্বাধীন তদন্ত নির্দোষকে রক্ষা করে; অভিযোগ সত্য হলে সেটিই পরিবারকে বিশ্বাসযোগ্য উত্তর দেয়।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ৩ সেপ্টেম্বর বলেছিল, কমিটির কিছু ইতিবাচক সংশোধন সত্ত্বেও গুম ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্তে স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বার্থের দ্বন্দ্বমুক্ত ব্যবস্থার মৌলিক ঘাটতি রয়ে গেছে। প্রথম আলোও প্রস্তাবিত বিলে ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের তুলনায় এমন স্বাধীন তদন্ত কাঠামো না থাকার প্রশ্ন তুলেছিল। এগুলো সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন, চূড়ান্ত আদালতের সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু দুটি স্বাধীন মূল্যায়ন একই প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকির দিকে ইঙ্গিত করায় সরকারকে কেবল ‘বিশ্বাস করুন’ বললে চলবে না; নকশাগত জবাব দিতে হবে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ একদল সংগঠন জুনে প্রস্তাবিত মানবাধিকার কমিশন বিল নিয়ে যে আপত্তি জানিয়েছিল, তার কেন্দ্রও ছিল আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তা সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগের স্বাধীন যাচাই। তারা বলেছিল, কার্যকর কমিশনের নিজের তদন্ত, নথি চাওয়া, সাক্ষ্য গ্রহণ ও আটকস্থান পরিদর্শনের বাস্তব সক্ষমতা প্রয়োজন। এটি বাংলাদেশের জন্য বাইরের কোনো রাজনৈতিক নির্দেশ নয়; জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিয়ে বহুল স্বীকৃত নীতির একটি মানদণ্ড।
কনভেনশনের মানদণ্ডে পরীক্ষাটি
বাংলাদেশ গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক কনভেনশনের পক্ষভুক্ত। কনভেনশনের ১২ অনুচ্ছেদে অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা এবং প্রয়োজন হলে পূর্ণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের কথা বলা আছে। ফলে প্রশ্নটি শুধু বিরোধী দলের বা কোনো এনজিওর আপত্তি নয়। রাষ্ট্র নিজের গ্রহণ করা আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে তদন্ত-কাঠামো কতটা মেলাতে পারছে, সেটিও একটি পরিমাপযোগ্য বিষয়।
শাস্তি বড় হলেই এই মানদণ্ড পূরণ হয় না। গুমের মামলায় প্রথম ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় ফোন, সিসিটিভি, গাড়ির চলাচল, হেফাজতের রেজিস্টার এবং সম্ভাব্য আটকস্থান সংরক্ষণ করা না গেলে পরে সত্য বের করা কঠিন হয়ে যায়। তাই স্বাধীন তদন্ত শুধু বিচার শুরুর শেষ ধাপ নয়; এটি শুরুতেই প্রমাণ হারিয়ে যাওয়া ঠেকানোর ব্যবস্থা।
এখানে ‘অন্য বাহিনী’ এবং ‘স্বাধীন তদন্ত’ এক জিনিস নয়। অন্য কোনো সংস্থা অভিযুক্ত সংস্থার সদস্য নয়—এটি স্বার্থের দ্বন্দ্ব কমাতে পারে। কিন্তু নিয়োগ, বদলি, বাজেট, নথি পাওয়ার অনুমতি, ফরেনসিক সহায়তা এবং তদন্তের ফল প্রকাশের ক্ষমতা যদি একই নির্বাহী কাঠামোর হাতে থাকে, তাহলে বাইরের দৃষ্টিতে চাপের আশঙ্কা পুরোপুরি দূর হয় না। একটি সত্যিকারের স্বাধীন ব্যবস্থার পরীক্ষাযোগ্য বৈশিষ্ট্য থাকে: সে নিজে অভিযোগ নিতে পারে, দ্রুত আলামত জব্দ করতে পারে, আটকস্থান দেখতে পারে, কাউকে অনুমতি চাইতে হয় না, এবং তার সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ করতে পারে।
এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সবকটি পাস হওয়া বিলে আছে বা নেই—এমন চূড়ান্ত দাবি এখন করা যাবে না, কারণ সরকার এখনো ধারা-ভিত্তিক চূড়ান্ত গেজেট-পাঠ প্রকাশ করেনি। এই অনিশ্চয়তাই স্বচ্ছতার প্রশ্ন। আইন যত সংবেদনশীল, নাগরিকের পক্ষে তার পাঠ যাচাই করা তত সহজ হওয়া উচিত। সংসদীয় আলোচনা, কমিটি-সংশোধনী, ভোটের ফল এবং গেজেট কপি একই স্থানে সহজে পাওয়া গেলে সরকারও ভুল ব্যাখ্যা থেকে সুরক্ষা পায়।
পরিবারের দিক থেকে হিসাবটি আরও সরাসরি। কাউকে খুঁজে না পাওয়ার সময় চাকরি, ব্যাংক হিসাব, ভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও সম্পত্তির সিদ্ধান্ত থেমে যেতে পারে। আইন তথ্যভান্ডার, সুরক্ষা ও প্রতিকারের কথা বললে তার বাস্তব পরীক্ষা হবে পরিবার কী তথ্য পেল এবং কত দ্রুত পেল—সেখানে। শুধু মামলার নম্বর দেওয়া যথেষ্ট নয়। কোন কর্মকর্তা দায়িত্বে, শেষ কোন প্রমাণটি পরীক্ষা হয়েছে, পরের পদক্ষেপ কখন এবং পরিবার কীভাবে নিরাপদে অভিযোগ বা নতুন তথ্য দিতে পারবে—এসব জানার অধিকারও কার্যকর প্রতিকারের অংশ।
তাই সরকারের জন্য সবচেয়ে কার্যকর জবাব প্রতিরক্ষামূলক বক্তব্য নয়, প্রকাশ্য কর্মপরিকল্পনা। প্রথম ছয় মাসে কত তদন্তকারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে, কতটি আটকস্থান ও হেফাজত রেজিস্টার অডিট হবে, জাতীয় তথ্যভান্ডারে কোন তথ্য থাকবে, এবং অভিযোগ পাওয়া থেকে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু হওয়ার সর্বোচ্চ সময় কত—এসব মাপযোগ্যভাবে জানানো দরকার। যে কোনো আইন প্রবর্তনের সময় বাস্তবায়ন সক্ষমতা না থাকলে কাগজের অধিকার বাস্তবে অধিকার হয়ে ওঠে না।
সংসদের ভূমিকাও এখানেই শেষ নয়। স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটিগুলো প্রতি তিন বা ছয় মাসে একটি প্রকাশ্য বাস্তবায়ন-শুনানি করতে পারে। সেখানে মামলা বা ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ না করেও অভিযোগের সংখ্যা, তল্লাশি বা প্রমাণ-সংরক্ষণ আদেশ, তদন্তের গড় সময়, অভিযোগ খারিজের কারণ, সাক্ষী সুরক্ষার আবেদন এবং শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা সম্বন্ধে সমষ্টিগত তথ্য দেওয়া সম্ভব। এই তথ্য নিয়মিত প্রকাশ হলে আইনটির পক্ষে বা বিপক্ষে রাজনৈতিক স্লোগানের বদলে ফলাফল নিয়ে আলোচনা করা যাবে।
ভুল বা মিথ্যা অভিযোগের ঝুঁকিও বাস্তব। তাই নির্দোষ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষার জন্য ন্যায্য যাচাই দরকার। কিন্তু অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া আর ইচ্ছাকৃত মিথ্যা অভিযোগ এক নয়। তদন্তের শুরুতেই পরিবারকে শাস্তির ভয় দেখালে তথ্য গোপন হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে; আবার যাচাইয়ের ন্যায্য নিয়ম না থাকলে অন্যায়ের অভিযোগে মানুষের আস্থা কমে। স্বাধীন, কারণ-লিখিত এবং পর্যালোচনাযোগ্য তদন্ত এই দুই ঝুঁকির মধ্যেই সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা দেয়।
এখানে বিচারিক নজরদারিও গুরুত্বপূর্ণ। জরুরি তল্লাশি, নথি সংরক্ষণ বা পরিবারকে তথ্য দেওয়ার আদেশের বিরুদ্ধে দ্রুত আদালতে যাওয়ার পরিষ্কার পথ থাকলে তদন্তকারী সংস্থা একা সিদ্ধান্তের কেন্দ্র থাকে না। একইভাবে অভিযোগকারীর আইনজীবীকে অগ্রগতির সীমিত কিন্তু অর্থবহ তথ্য দেওয়ার নিয়ম থাকলে ভুক্তভোগী পরিবার তদন্তের বাইরে পড়ে থাকে না। গোপনীয়তা রক্ষা অবশ্যই দরকার, কিন্তু গোপনীয়তা যেন অজবাবদিহির অজুহাত না হয়।
এখন সরকারের সামনে পাঁচটি প্রকাশ্য কাজ
- চূড়ান্ত গেজেট-পাঠ, কমিটি-সংশোধনী এবং ২০২৫ সালের অধ্যাদেশের সঙ্গে ধারা-ভিত্তিক তুলনা প্রকাশ করা।
- অভিযুক্ত বাহিনী বাদ দেওয়ার বাইরে তদন্তকারীকে কোন কর্তৃপক্ষ নিয়োগ, বদলি বা অপসারণ করতে পারবে, তা পরিষ্কার করা।
- জরুরি প্রমাণ সংরক্ষণ, আটকস্থান পরিদর্শন, নথি তলব ও সাক্ষী সুরক্ষার স্বাধীন প্রটোকল প্রকাশ করা।
- জাতীয় তথ্যভান্ডারে কত অভিযোগ, কতজন উদ্ধার, কত তদন্ত শুরু, কত অভিযোগ বাতিল এবং কেন—তার নিয়মিত সমষ্টিগত তথ্য প্রকাশ করা।
- ভুক্তভোগী পরিবার, অধিকারকর্মী, আইনজীবী ও জাতিসংঘের প্রাসঙ্গিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বাস্তবায়ন-বিধি নিয়ে প্রকাশ্য পরামর্শ করা।
শেষ কথা
গুমবিরোধী বিল পাস হওয়াকে ব্যর্থতা বলা ঠিক হবে না। রাষ্ট্র একটি গুরুতর অপরাধকে স্বীকার করেছে, শাস্তি ও প্রতিকারের পথ লিখেছে, এবং মানবাধিকার কমিশনের জন্য নতুন কাঠামো এনেছে। এগুলো বাস্তব অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
কিন্তু অগ্রগতির দাবি সবচেয়ে শক্ত হয় যখন সেটি পরীক্ষা করা যায়। সরকার যদি সত্যিই একটি এমন বাংলাদেশ চায় যেখানে ক্ষমতাবান সংস্থার বিরুদ্ধেও গুমের অভিযোগ চাপা পড়ে না, তবে তাকে চূড়ান্ত পাঠ ও স্বাধীন তদন্তের বাস্তব নিশ্চয়তা প্রকাশ করতে হবে। শাস্তির প্রতিশ্রুতির পরে এটাই আইনের পরবর্তী এবং সবচেয়ে জরুরি জবাবদিহির পরীক্ষা।
তথ্যসূত্র
- বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়, বা. জা. স. বিল নং ১০৬ ও ১০৭/২০২৬-এর সরকারি গেজেট সূচি, ২৭ আগস্ট ২০২৬
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ‘JS passes 3 bills including Enforced Disappearance Bill, Human Rights Commission Bill’, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- দ্য ডেইলি স্টার, ‘NHRC, enforced disappearance bills passed’, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, কমিটি-সংশোধনের পরও স্বাধীন তদন্ত নিয়ে বিবৃতি, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও সহস্বাক্ষরকারী সংগঠনসমূহ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিলের স্বাধীনতা নিয়ে মূল্যায়ন, ২২ জুন ২০২৬
- প্রথম আলো, প্রস্তাবিত গুমবিরোধী আইনে স্বাধীন তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন, ৩০ আগস্ট ২০২৬
- জাতিসংঘ চুক্তি সংগ্রহ, সব ব্যক্তিকে গুম থেকে সুরক্ষার আন্তর্জাতিক কনভেনশনে বাংলাদেশের ৩০ আগস্ট ২০২৪-এর যোগদান ও কনভেনশনের পাঠ
