৬৪ জেলার সরকারি কাজ তদারকিতে ৩০ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের হুইপকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ২৭ আগস্টের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে আইনশৃঙ্খলা, দুর্নীতি ও মাদক নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন এবং জনকল্যাণমূলক কাজের কথা আছে। কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখার এই উদ্যোগ ফলপ্রসূও হতে পারে। কিন্তু একটি সরল প্রশ্ন আগে মেটাতে হবে: এই অতিরিক্ত তদারকির ফল জনগণ কীভাবে জানবে?
প্রজ্ঞাপনে দায়িত্বপ্রাপ্তদের সরকারি দপ্তরকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া, নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন ও বিভিন্ন উন্নয়ন-কর্মসূচি তদারকির কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে তাঁরা জেলা পর্যায়ের সভায় অংশ নিতে পারবেন। কিন্তু প্রকাশিত নথিতে প্রতিটি জেলার জন্য কাজের সূচক, নির্দিষ্ট সময়ের প্রতিবেদন, সিদ্ধান্তের নথি বা নাগরিক অভিযোগ নেওয়ার আলাদা পথ বলা নেই। এখানেই উদ্যোগের জবাবদিহির পরীক্ষা।
সরকারের লক্ষ্যটি উপেক্ষা করার নয়
সরকারের অবস্থান নথিতেই স্পষ্ট। প্রজ্ঞাপনে টেকসই উন্নয়ন, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও দুর্নীতি প্রতিরোধকে অগ্রাধিকার বলা হয়েছে; দায়িত্বপ্রাপ্তদের আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে সরকারি দপ্তরকে পরামর্শ এবং কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক নিরাপত্তার কাজ তদারকির কথা বলা হয়েছে। দায়িত্বটি আইনশৃঙ্খলা পরিচালনার ক্ষমতা হস্তান্তর নয়; প্রকাশিত ভাষায় এটি পরামর্শ ও তদারকির ভূমিকা।
এই সীমাটি গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের ৫৫(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর কর্তৃত্বে প্রয়োগের কথা; মন্ত্রিসভা সংসদের কাছে যৌথভাবে দায়বদ্ধ। তাই নতুন দায়িত্বের সাফল্য নির্ভর করবে এটি বিদ্যমান প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ও দায়বদ্ধতার রেখা পরিষ্কার রাখে কি না, নাকি সিদ্ধান্ত কে নিল এবং কার কাছে জবাব দেবে—সেই প্রশ্নকে ঝাপসা করে কি না।
একটি দায়িত্বপত্র, কিন্তু ফল মাপার প্রকাশ্য মানদণ্ড নেই
প্রজ্ঞাপন জেলা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির তালিকা দিয়েছে এবং তিন ধরনের কাজের কথা বলেছে: সরকারি দপ্তরকে পরামর্শ, উন্নয়ন ও জনকল্যাণের কাজ তদারকি, আর প্রয়োজন হলে জেলা-সভায় অংশগ্রহণ। কিন্তু নথিটি কতবার সভা হবে, কোন সমস্যা লিখিতভাবে তোলা হবে, কোন সুপারিশ মানা হলো বা হলো না, কিংবা কত দিনের মধ্যে ফল জানানো হবে—তা নির্দিষ্ট করে না। এটি কোনো বেআইনি কাজের প্রমাণ নয়; বরং সদ্য চালু কাঠামোর এমন ফাঁক, যা এখনই স্বচ্ছভাবে পূরণ করা সম্ভব।
এখন প্রশ্ন হলো—একই জেলায় মন্ত্রী বা হুইপের পরামর্শ, জেলা প্রশাসনের দায়িত্ব, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির দাবি ভিন্ন হলে কোন সিদ্ধান্তটি রেকর্ড হবে? প্রকাশ্য কার্যবিবরণী না থাকলে নাগরিক বুঝতে পারবেন না, কোন বাধা প্রশাসনিক, কোনটি নীতিগত, আর কোন প্রতিশ্রুতি অপূর্ণ রইল। তখন তদারকির বদলে দায় এড়ানোর নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সমস্যা আগের, কিন্তু জবাবদিহি এখনকার
প্রজ্ঞাপনে আগের সরকারের সময়ে উন্নয়ন-বরাদ্দে দুর্নীতি, অর্থপাচার ও জননিরাপত্তার ঝুঁকির অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের কাজ তদন্ত ও আদালতের; বর্তমান প্রজ্ঞাপন নিজে কোনো ব্যক্তির দায় প্রমাণ করে না। তবে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব আলাদা: যে ঘাটতি ও ঝুঁকির কথা বলে নতুন ব্যবস্থা করা হলো, তার প্রতিকার কতটা হলো—তার যাচাইযোগ্য হিসাব দেওয়া।
সেই কারণে পুরোনো সমস্যার দায় দেখিয়ে নতুন কাঠামোর ফল না জানানো গ্রহণযোগ্য নয়। একটি জেলা-ভিত্তিক প্রকাশ্য তালিকায় প্রকল্পের অগ্রগতি, অনিয়মের অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উত্তর, সুপারিশ এবং পরের মাসে কী বদলাল—এসব থাকলে নাগরিক ও সংসদ দুপক্ষই কাজটি যাচাই করতে পারবে।
দেখার মতো চারটি নথি
- প্রতিটি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির জেলা-ভিত্তিক কাজের পরিধি ও কোন দপ্তরে তিনি পরামর্শ দিতে পারেন—তা এক পৃষ্ঠায় প্রকাশ করা।
- মাসিক সভা, লিখিত সুপারিশ, গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের কারণ এবং বাস্তবায়নের অবস্থা নিয়ে উন্মুক্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা।
- নাগরিকের অভিযোগ নেওয়া ও অগ্রগতি জানার নিরাপদ পথ রাখা; অভিযোগের নিষ্পত্তি না হলে কোন দপ্তর দায়ী, তা দেখানো।
- ছয় মাস পর সংসদে সমন্বিত ফলাফল ও সীমাবদ্ধতার প্রতিবেদন দেওয়া, যাতে কাঠামোটি সংশোধন বা বন্ধের সিদ্ধান্তও প্রমাণভিত্তিক হয়।
শেষ কথা: উপস্থিতি নয়, ফলের হিসাব
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের এই উদ্যোগকে কেবল রাজনৈতিক উপস্থিতি বাড়ানোর ব্যবস্থা ধরে নেওয়া ন্যায্য হবে না; সরকারি ব্যাখ্যায় এটি সমন্বয়, সুশাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধের চেষ্টা। কিন্তু ভালো উদ্দেশ্যকে ফলের বিকল্প বানানোও ঠিক নয়। ৬৪ জেলায় ৩০ জনের উপস্থিতি নয়, কোন নাগরিক-সমস্যা সমাধান হলো, কোন সুপারিশ বাস্তবায়িত হলো, আর কোথায় কাজ থেমে আছে—সেই তথ্যই উদ্যোগটির আসল পরিচয় দেবে।
আমাদের বিবেচনায়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে এখনই একটি উন্মুক্ত জেলা-তদারকি ড্যাশবোর্ড এবং ছয় মাসের পর্যালোচনার সময়সীমা ঘোষণা করা উচিত। তাতে মাঠের প্রশাসনও জানবে কোন নির্দেশ লিখিত, নাগরিকও জানবে কার কাছে প্রশ্ন করতে হবে, আর সরকারও প্রমাণ করতে পারবে যে অতিরিক্ত দায়িত্ব মানে অতিরিক্ত জবাবদিহি।
তথ্যসূত্র
- মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ: জেলা-ভিত্তিক সরকারি কার্যাবলী তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব প্রদানের প্রজ্ঞাপন—২৭ আগস্ট ২০২৬
- বাংলাদেশ গেজেট: জেলা-ভিত্তিক তদারকি ও সমন্বয়সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনের সংযুক্ত সরকারি PDF—২৭ আগস্ট ২০২৬
- বাংলাদেশের আইন: সংবিধানের ৫৫ অনুচ্ছেদ—প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা ও যৌথ দায়বদ্ধতা
- মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারি দপ্তর-বণ্টন—হালনাগাদ ৯ আগস্ট ২০২৬
- bdnews24.com: ত্রয়োদশ সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সময়সূচি ও প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি—২৭ আগস্ট ২০২৬
