NCP Diaspora Alliance GermanyNCP Diaspora Alliance Germanyমূল ওয়েবসাইট →

প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি

আট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে চেয়ারম্যান নিয়োগ: শর্ত মানার নথি কোথায়?

সম্পাদকীয় ডেস্ক · ১৫ আগস্ট ২০২৬

সরকার আট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে। কয়েকটি প্রজ্ঞাপনে সংগঠনের সঙ্গে কর্মসম্পর্ক ছাড়ার শর্তও আছে। প্রশ্ন হলো—শর্তটি সত্যিই মানা হয়েছে কি না, জনগণ তা যাচাই করবে কীভাবে?

জনস্বার্থ, নথি ও জবাবদিহির প্রতীকী সম্পাদকীয় চিত্র

NCP Diaspora Alliance Germany-এর সম্পাদনা–বিশ্লেষণ চিত্র; এটি কোনো বাস্তব ঘটনার ছবি নয়।

প্রশ্নটা খুব সহজ

রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন—এ কারণে কেউ স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রীয় পদের অযোগ্য হয়ে যান না। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হওয়াও কোনো অভিযোগ নয়। কিন্তু নিয়োগপত্রেই যদি দল বা সংগঠনের সঙ্গে কর্মসম্পর্ক ছাড়ার শর্ত থাকে, তাহলে সেটি মানা হয়েছে কি না—এ প্রশ্ন আর ব্যক্তিগত পছন্দের থাকে না। জনগণের সামনে নথি দিয়ে উত্তর দেওয়ার দায় তৈরি হয়।

সরকার আসলে কী করেছে?

প্রথম আলোর ১৩ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা ও কক্সবাজার—এই আট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে। প্রতিবেদনে আটজনের সাতজনকে ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ময়মনসিংহ ও রংপুরসহ নতুন কয়েকটি কর্তৃপক্ষের আইনি ভিত্তি ২০২৬ সালের গেজেটে এসেছে। ফলে এগুলো আলংকারিক পদ নয়; নগর পরিকল্পনা, ভূমি ব্যবহার ও বড় উন্নয়ন সিদ্ধান্তে চেয়ারম্যানের বাস্তব ক্ষমতা আছে।

প্রজ্ঞাপনে কী শর্ত আছে?

বাসস ১২ জুন রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে সামসুজ্জামান সামুর নিয়োগের খবর দেয়। উদ্ধৃত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, তাঁকে অন্য পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে কর্মসম্পর্ক ছাড়তে হবে। ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জের নিয়োগসংক্রান্ত সংবাদেও একই ধরনের শর্ত আছে। উদ্দেশ্যটি পরিষ্কার: রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত যেন অন্য কোনো সাংগঠনিক আনুগত্য বা ব্যক্তিগত স্বার্থের প্রভাবে না পড়ে।

সরকার কী যুক্তি দিতে পারে?

সরকারের আলাদা ব্যাখ্যামূলক বিবৃতি এই নিয়োগগুলোর বিষয়ে পাওয়া যায়নি। তবে শক্তিশালী যুক্তিটি হতে পারে—স্থানীয় রাজনীতি, নগরবাসীর চাহিদা ও প্রশাসনিক বাস্তবতা জানা ব্যক্তিরা নতুন কর্তৃপক্ষ দ্রুত চালু করতে সাহায্য করতে পারেন। নিয়োগগুলো এক বছরের চুক্তিভিত্তিক এবং আইনে বা প্রজ্ঞাপনে কর্মসম্পর্ক ত্যাগের শর্ত থাকায় সরকার বলতে পারে যে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার সুরক্ষা আগেই রাখা হয়েছে। এই যুক্তি পুরোপুরি অযৌক্তিক নয়।

সন্দেহের জায়গা কোথায়?

কাগজে শর্ত লেখা আর বাস্তবে তা মানা এক কথা নয়। ১৪ আগস্টের সম্পাদকীয়তে প্রথম আলো দাবি করেছে, সরকারি সংস্থা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে নিয়োগ পাওয়া একাধিক ব্যক্তি দলীয় দায়িত্ব ছাড়েননি। আমরা প্রতিটি ব্যক্তির ক্ষেত্রে দাবিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারিনি। তাই এটিকে প্রমাণিত সত্য বলা হচ্ছে না; বরং নথি চাওয়ার কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমাধান কঠিন নয়—পদত্যাগ বা অব্যাহতির তারিখ, তা গ্রহণের নথি এবং স্বার্থের সংঘাত-ঘোষণা প্রকাশ করলেই অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলবে।

এখন পর্যন্ত আমরা কী জানি?

আগের ভুলের পুনরাবৃত্তি ঠেকাব কীভাবে?

আগের সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয় আনুগত্যে চালানোর বহু অভিযোগ ছিল। সেই ইতিহাস দেখিয়ে বর্তমানের প্রতিটি নিয়োগকে অবৈধ বলা যাবে না। শিক্ষা বরং উল্টো: নতুন সরকারকে আগের চেয়ে উঁচু স্বচ্ছতার মানে নিজেকে মাপতে হবে। কে কোন দলের ছিলেন, সেটি একমাত্র প্রশ্ন নয়; কী যোগ্যতায় নিয়োগ পেলেন, স্বার্থের সংঘাত কীভাবে সামলাবেন এবং কাজের ফল কী—এই হিসাবই পার্থক্য গড়বে।

এই নিয়োগে কার লাভ, কার ক্ষতি?

যোগ্যতা ও স্বাধীনতার ভিত্তিতে নিয়োগ হলে লাভবান হন নগরবাসী: মাস্টারপ্ল্যান, জলাবদ্ধতা, আবাসন, রাস্তা ও ভূমি ব্যবহারের সিদ্ধান্তে তারা একটি জবাবদিহিমূলক কর্তৃপক্ষ পান। কিন্তু নিয়োগকে দলীয় পুরস্কার মনে হওয়ার সুযোগ থাকলে ক্ষতি হয় সবার—পেশাদার কর্মকর্তা স্বাধীনভাবে পরামর্শ দিতে সংকোচ বোধ করেন, ব্যবসায়ী ও নাগরিকের কাছে সমান সুযোগের বিশ্বাস কমে, আর ভবিষ্যৎ সরকারও একই নজির ব্যবহার করতে পারে। নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন, কারণ তাঁদের দক্ষতার মূল্যায়ন দলীয় পরিচয়ের আড়ালে চলে যায়।

স্থানীয় অভিজ্ঞতার যুক্তি কতটা টেকে?

স্থানীয় অভিজ্ঞতা একটি বৈধ সম্পদ, কিন্তু তা দলীয় পদ ধরে রাখার ছাড়পত্র নয়। বরং প্রজ্ঞাপনের শর্তটি মানলে সরকার তার যুক্তি শক্ত করতে পারে। শুধু ‘চুক্তিভিত্তিক’ বললে যথেষ্ট নয়; দায়িত্বের মেয়াদ যত কমই হোক, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে ভূমি ও সরকারি সম্পদের প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী। তাই নিয়োগের আগে ও পরে যোগ্যতা, সম্পদ ও স্বার্থের সংঘাতের ঘোষণাও প্রকাশ করা দরকার।

এখন সরকারের পাঁচটি কাজ

শেষ কথা: শর্ত লিখলেই হবে না, প্রমাণও দিতে হবে

এই লেখায় কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণিত অনিয়মের অভিযোগ করা হচ্ছে না। প্রশ্নটি আরও মৌলিক: নিরপেক্ষতার শর্ত সরকার নিজেই লিখেছে, তাই সেটি মানার প্রমাণ দেওয়ার দায়িত্বও সরকারের। দলীয় পরিচয় কাউকে একাই অযোগ্য করে না; আবার দলীয় পদ, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা অস্পষ্ট রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়। নথি প্রকাশ করলে বিতর্ক কমবে, নিয়োগপ্রাপ্তরা নিজেদের বৈধতা দেখানোর সুযোগ পাবেন, আর জুলাই-পরবর্তী জবাবদিহির প্রতিশ্রুতি বাস্তব নিয়মে রূপ নেবে।

সম্পাদকীয় নোট: এই বিশ্লেষণটি ১৫ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া সরকারি গেজেট, রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং প্রকাশিত সংবাদ-সম্পাদকীয়র ওপর ভিত্তি করে। কোনো ব্যক্তির দলীয় পদত্যাগ বা দায়িত্ব ছাড়ার অবস্থা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি; সে কারণেই লেখাটি নথি প্রকাশ ও যাচাইয়ের দাবি পর্যন্ত সীমিত।

তথ্যসূত্র

  1. বাংলাদেশ গেজেট/সরকারি মুদ্রণালয়: রংপুর ও ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২৬—১০ এপ্রিল ২০২৬
  2. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: সামসুজ্জামান সামুর নিয়োগপ্রজ্ঞাপনের শর্ত—১২ জুন ২০২৬
  3. প্রথম আলো: আট নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষে চেয়ারম্যান নিয়োগ ও সাতজনের বিএনপি-পরিচয়—১৩ জুন ২০২৬
  4. প্রথম আলো সম্পাদকীয়: সরকারি সংস্থায় নিয়োগ ও শর্ত পরিপালনের প্রশ্ন—১৪ আগস্ট ২০২৬
  5. প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়: বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও সরকার-সম্পর্কিত সরকারি তথ্য