৬ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু নিয়ে ১,৫৫৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ড্যাশবোর্ডে এটিই চলতি বছরের সর্বোচ্চ দৈনিক ভর্তি। একই সময়ের হিসাবে চারজনের মৃত্যু এবং বছরজুড়ে মোট ৪২,৫৯০ জন ভর্তি ও ১১৭ জন মৃত্যুর তথ্যও সেখানে আছে। এমন দিনে জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন শুধু ‘অভিযান চলছে কি না’ হতে পারে না। প্রশ্ন হলো, কোন এলাকায় ঝুঁকি বেশি, সেখানে কী কাজ হলো, এবং পরের সপ্তাহে তার ফল কী দাঁড়াল—এই হিসাব কি নাগরিক দেখবেন?
এটি কোনো একটি সিটি করপোরেশন বা একটি দপ্তরকে প্রতিটি সংক্রমণ ও মৃত্যুর দায়ী ঘোষণা করার লেখা নয়। ডেঙ্গুতে বৃষ্টি, তাপমাত্রা, মানুষের ঘরের ভেতর ও আশপাশে জমে থাকা পানি, রোগী দ্রুত পরীক্ষা করাতে পারছেন কি না, এবং হাসপাতালের প্রস্তুতি—সবই কাজ করে। কিন্তু কারণ অনেক বলেই দায়িত্বও অস্পষ্ট হতে পারে না। ঝুঁকি যখন দিনে দিনে দৃশ্যমান, তখন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার বিভাগ, দুই সিটি করপোরেশন এবং জেলার স্থানীয় প্রশাসনকে একই মাপে কাজের ফল দেখাতে হয়।
সংখ্যাটি কী বলে, আর কী বলে না
১,৫৫৮ জন একটি ২৪ ঘণ্টার ভর্তি-সংখ্যা। এটিকে দেশের সব সংক্রমণের পূর্ণ হিসাব বলা যাবে না; যাঁরা হাসপাতালে যাননি, তাঁদের এই সূচকে ধরা পড়ে না। আবার এটিকে কোনো এক দিনের মশকনিধন কর্মসূচির সরাসরি ফলও বলা যায় না। তবু এটি একটি স্পষ্ট সতর্কসংকেত। দৈনিক ভর্তি এক বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে গেলে হাসপাতালের শয্যা, পরীক্ষা, রক্তের উপাদান, চিকিৎসক ও নার্সের চাপ, এবং মানুষ কখন চিকিৎসা নিতে আসছেন—সবগুলো বিষয় একসঙ্গে নজরে আনা দরকার।
সরকারি ড্যাশবোর্ডের ৬ সেপ্টেম্বরের হিসাবে মোট ভর্তি ছিল ৪২,৫৯০ এবং মৃত্যু ১১৭। অর্থাৎ এক দিনের রেকর্ডকে বিচ্ছিন্ন আতঙ্কে না বদলে চলমান চাপের অংশ হিসেবে দেখা উচিত। দ্য ডেইলি স্টারের একই দিনের প্রতিবেদনে ডিজিএইচএসের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, তখন বিভিন্ন হাসপাতালে ২,৯৯৫ জন রোগী চিকিৎসাধীন ছিলেন। ফলে কেবল নতুন ভর্তির রেখা নয়, হাসপাতালে থাকা মোট রোগীর চাপও সিদ্ধান্তের অংশ হওয়া উচিত।
এখানে সতর্কতার আরেকটি কারণ আছে। দৈনিক সংখ্যার ওঠানামা রিপোর্টিংয়ের সময়, ছুটির দিন বা হাসপাতালভিত্তিক নথিভুক্তির ওপরও প্রভাবিত হতে পারে। তাই সরকারের সেরা প্রতিরক্ষা হতে পারে নিয়মিত, একই পদ্ধতিতে প্রকাশিত তথ্য। সাত দিনের চলমান গড়, ওয়ার্ড বা উপজেলা-ভিত্তিক ঝুঁকির মানচিত্র, ভর্তি ও শয্যার চাপ, এবং মৃত্যুর নিরীক্ষিত পর্যালোচনা প্রকাশ করলে এক দিনের বড় সংখ্যা নিয়ে অনুমানের বদলে বাস্তব প্রবণতা দেখা যায়।
প্রশাসকের যুক্তি ন্যায্য, কিন্তু সেটিরও মাপ দরকার
৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রথম আলোর প্রতিবেদনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম মশক নিয়ন্ত্রণ জোরদার ও সমন্বিত করার নির্দেশ দেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা গুরুত্বপূর্ণ: শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়; প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা এবং নাগরিকের সরাসরি অংশগ্রহণও দরকার। ওই সভায় ডিএসসিসির সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য হিসেবে বলা হয়, প্রায় ৬০ শতাংশ বাসাবাড়িতে লার্ভা পাওয়া গেছে।
এই ব্যাখ্যাকে খাটো করার সুযোগ নেই। ঘরের ছাদ, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণস্থল বা ছোট জলাধারে জমা পানি সিটি করপোরেশনের কর্মী একা প্রতিদিন সরাতে পারবেন না। বৃষ্টি হলে ঝুঁকিও বাড়ে। নাগরিকের দায়িত্বের কথা বলা তাই দায় এড়ানো নয়, যদি প্রশাসন একই সঙ্গে নিজের কাজের নির্দিষ্ট হিসাব দেয়। বরং প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়িতে লার্ভা পাওয়ার তথ্যটি দেখায় যে সাধারণ আহ্বানের বাইরে লক্ষ্যভিত্তিক, পুনঃপরিদর্শনযোগ্য কাজ দরকার।
সমস্যা তখনই হবে, যদি নাগরিকের ভূমিকার কথা বলার পর সরকারি কাজটি অদৃশ্য থেকে যায়। কোন ওয়ার্ডে কতটি বাড়ি, নির্মাণস্থল ও বাজার পরিদর্শন হলো; কোথায় লার্ভা মিলল; কতটি প্রজননস্থল অপসারণ হলো; কত জায়গায় পুনরায় লার্ভা পাওয়া গেল; কোন অভিযোগ কত সময়ে নিষ্পত্তি হলো—এগুলো প্রকাশ হলে নাগরিকও বুঝতে পারবেন তাঁর দায়িত্ব কোথায়, আর কর্তৃপক্ষের ফল কোথায়।
অভিযানের বদলে ফল দেখানোর ন্যূনতম কাঠামো
সিটি করপোরেশনগুলো অনেক সময় অভিযান, ফগিং, পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি বা ভ্রাম্যমাণ আদালতের খবর দেয়। এগুলো কাজের সূচনা হতে পারে, কিন্তু ফলের প্রমাণ নয়। একটি ফগিং গাড়ি কত কিলোমিটার চলল, সেটি কম গুরুত্বপূর্ণ; তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে লার্ভার হার কমল কি না এবং মানুষ দ্রুত অভিযোগের প্রতিকার পেলেন কি না। কাজের মাপকাঠি বদলালে ব্যর্থতার দায় চাপানো নয়, সফলতারও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ তৈরি হয়।
- প্রতি সপ্তাহে ওয়ার্ডভিত্তিক পরিদর্শিত বাড়ি, স্থাপনা ও নির্মাণস্থলের সংখ্যা; লার্ভা পাওয়া স্থান এবং পুনঃপরিদর্শনের ফল।
- প্রজননস্থল ধ্বংস, জরিমানা বা নোটিশের সংখ্যা নয় শুধু; কতটি স্থানে সাত বা চৌদ্দ দিনের মধ্যে ঝুঁকি কমেছে তার ফল।
- ফগিং ও লার্ভিসাইডের এলাকা, তারিখ, ব্যবহৃত উপকরণ এবং কেন ওই এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলো।
- হেল্পলাইন বা স্থানীয় অভিযোগের সংখ্যা, প্রতিকার সময় এবং পুনরাবৃত্ত অভিযোগের মানচিত্র।
- সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু শয্যা, ভর্তি, রেফারাল, পরীক্ষা এবং জরুরি রক্ত-উপাদানের সাপ্তাহিক প্রস্তুতি।
- স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় সরকারের যৌথভাবে প্রকাশিত সাত দিনের প্রবণতা, যাতে এক দিনের ওঠানামার সঙ্গে কাজের ফল মিলিয়ে দেখা যায়।
এই তথ্যের সবটাই ব্যক্তিগত তথ্য নয়। রোগীর নাম বা বাড়ির সুনির্দিষ্ট পরিচয় গোপন রেখেও ওয়ার্ড বা মহল্লা পর্যায়ের সারাংশ প্রকাশ করা যায়। জনস্বাস্থ্যের কাজে গোপনীয়তার গুরুত্ব আছে, কিন্তু গোপনীয়তাকে এমন অজুহাত করা ঠিক নয় যাতে নাগরিক জানতেই না পারেন কোন এলাকায় প্রশাসনিক সাড়া সময়মতো পৌঁছাচ্ছে। তথ্যকে নির্দিষ্ট এলাকার ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করলে মজুত, জনবল ও প্রচারও ভালোভাবে বণ্টন করা যায়।
নজরদারির তথ্যকে সিদ্ধান্তে আনার উপায়
ডিজিএইচএসের দৈনিক ড্যাশবোর্ডের বড় শক্তি হলো, তা রোগী ও মৃত্যুর চাপকে দৃশ্যমান করে। এই ধরনের ধারাবাহিক সরকারি তথ্য ছাড়া সংবাদমাধ্যম, হাসপাতাল বা স্থানীয় প্রশাসন একই পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন সংখ্যা ব্যবহার করতে পারে। কিন্তু নজরদারির একটি দ্বিতীয় কাজও আছে: কোথায় আগে ব্যবস্থা নিতে হবে তা নির্ধারণ করা। ভর্তি-সংখ্যা, হাসপাতালে থাকা রোগীর সংখ্যা, স্থানীয়ভাবে লার্ভা পাওয়ার হার এবং নাগরিক অভিযোগের তথ্য একই সময়সীমায় মিললে ঝুঁকির অগ্রাধিকার আরও স্পষ্ট হয়।
ধরা যাক, কোনো ওয়ার্ডে হাসপাতালে ভর্তি বাড়ছে কিন্তু সেখানে পরিদর্শনের সংখ্যা কম। আবার অন্য একটি এলাকায় পরিদর্শন অনেক, কিন্তু পুনঃপরিদর্শনে লার্ভা একই হারে থাকছে। প্রথম ক্ষেত্রে দ্রুত দল পাঠানো দরকার, দ্বিতীয় ক্ষেত্রে পদ্ধতি বদলানো দরকার। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে বড় কোনো গোপন প্রযুক্তি লাগে না। একই তারিখে নেওয়া, সংক্ষিপ্ত এবং তুলনাযোগ্য কয়েকটি সূচকই যথেষ্ট। ড্যাশবোর্ডের সংখ্যাকে মাঠপর্যায়ের কাজের সঙ্গে না জুড়লে তা সতর্কবার্তা দেয়, কিন্তু কোন প্রতিকার কাজ করল তা বলে না।
এখানে ‘ওয়ার্ডভিত্তিক’ মানে প্রতিটি বাড়ির পরিচয় প্রকাশ নয়। একটি ওয়ার্ডে কতটি স্থাপনা দেখা হলো, কতটিতে ঝুঁকি মিলল, কতটিতে দ্বিতীয়বার গিয়ে ঝুঁকি কমল এবং কোন ধরনের স্থানে বারবার সমস্যা দেখা গেল—এই সমষ্টিগত তথ্যই যথেষ্ট। এতে কোনো পরিবারকে জনসমক্ষে ছোট করা হয় না। বরং বাড়ির মালিক, বাজার সমিতি, নির্মাণপ্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রতিনিধিরা জানতে পারেন তাঁদের এলাকায় সমস্যার ধরন কী। প্রকাশ্য মানচিত্র তাই শাস্তির নথি নয়; অগ্রাধিকার ঠিক করার উপকরণ।
হাসপাতালের প্রস্তুতিও মশক নিয়ন্ত্রণের অংশ
মশার প্রজনন কমানোই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের কেন্দ্র। কিন্তু ভর্তি যখন এক দিনে ১,৫৫৮-তে ওঠে, তখন চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রস্তুতিকে আলাদা করে দেখা যায় না। রোগী কোন হাসপাতালে গেলেন, দ্রুত পরীক্ষা পেলেন কি না, শয্যা বা রেফারালের প্রয়োজন হলো কি না, এবং গুরুতর রোগীর জন্য জরুরি সেবা কতটা প্রস্তুত ছিল—এসব তথ্য রোগী ও স্বজনের বাস্তব সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। প্রতিটি পৃথক রোগীর চিকিৎসা নথি গোপন থাকবে; প্রয়োজন শুধু প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সক্ষমতার সংক্ষিপ্ত সারাংশ।
এই প্রকাশের উদ্দেশ্য হাসপাতালকে র্যাঙ্ক করা বা আতঙ্ক তৈরি করা নয়। বরং কোনো এলাকায় ভর্তির চাপ বাড়লে নিকটবর্তী প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত শয্যা, পরীক্ষার সরঞ্জাম, চিকিৎসক, নার্স বা রক্ত-উপাদানের চাহিদা আগে থেকে পাঠানোর সুযোগ তৈরি করা। দৈনিক সংখ্যা প্রকাশের সঙ্গে সাপ্তাহিক সক্ষমতা-সংকেত যোগ হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলতে পারবে কোথায় ব্যবস্থা নেওয়া হলো। নাগরিকও বুঝবেন কখন সরকারি পরামর্শ মেনে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়া জরুরি এবং কোথায় সেবা পাওয়া যেতে পারে।
দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে ৬ সেপ্টেম্বরের হিসাবে বিভিন্ন হাসপাতালে ২,৯৯৫ জন চিকিৎসাধীন থাকার কথা বলা হয়েছে। এই সংখ্যা নিজে কোনো হাসপাতাল অচল হওয়ার প্রমাণ নয়। তবে এটি মনে করিয়ে দেয় যে নতুন রোগীর দৈনিক হিসাবের পাশাপাশি ইতিমধ্যে ভর্তি থাকা মানুষের চাপও ব্যবস্থাপনায় ধরতে হয়। মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যদি সপ্তাহে অন্তত একবার সামগ্রিক প্রস্তুতির সারাংশ দেয়, তাহলে ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে’ ধরনের সাধারণ আশ্বাসকে পাঠক বাস্তব সূচকে যাচাই করতে পারবেন।
সমন্বয় মানে কারও দায় মুছে দেওয়া নয়
ডেঙ্গুতে একই সঙ্গে বহু সংস্থা কাজ করে বলে দায় একে অন্যের দিকে ঠেলে দেওয়া সহজ। স্বাস্থ্য বিভাগ বলতে পারে মশক নিয়ন্ত্রণ স্থানীয় সরকারের কাজ। সিটি করপোরেশন বলতে পারে ঘরের ভেতরের পানি নাগরিকের দায়িত্ব। নাগরিক বলতে পারেন তিনি অভিযোগ করলেও সাড়া পাননি। এই তিনটি কথার প্রতিটিতে আংশিক সত্য থাকতে পারে, কিন্তু আংশিক সত্যের যোগফল কোনো সমন্বিত ব্যবস্থা নয়। সমন্বয়ের প্রমাণ তখনই মেলে, যখন একই স্থানের ঝুঁকি, দায়িত্বপ্রাপ্ত দল, কাজের সময় এবং পরের ফল এক জায়গায় দেখা যায়।
একটি ব্যবহারিক নিয়ম হতে পারে: উচ্চ ঝুঁকির কোনো ওয়ার্ড চিহ্নিত হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন বা স্থানীয় সংস্থা সেখানে পরিকল্পিত পরিদর্শনের সারাংশ দেবে; সাত দিনের মধ্যে পুনঃপরিদর্শনের ফল প্রকাশ করবে; আর স্বাস্থ্য দপ্তর একই সময়ের ভর্তি ও চিকিৎসা-চাপের প্রবণতা দেখাবে। এটি আইনি শাস্তির বিকল্প নয় এবং সব সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানও নয়। তবে কে কী করলেন এবং ফল কী হলো—এই ন্যূনতম শৃঙ্খলা তৈরি করে।
সরকারের জন্যও এতে সুবিধা আছে। কোনো এলাকায় বৃষ্টি বা নাগরিকের অসহযোগিতার কারণে ঝুঁকি দ্রুত না কমলে, সময়-তারিখসহ মাঠের তথ্য দেখিয়ে কর্তৃপক্ষ ব্যাখ্যা করতে পারবে কেন অতিরিক্ত সহায়তা দরকার। আবার কাজের পর ঝুঁকি কমলে সেটিও কেবল বক্তৃতার দাবি থাকবে না; প্রকাশ্য ফল হবে। সঠিক তথ্য তাই সমালোচনার অস্ত্রই নয়, দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সুরক্ষাও।
জবাবদিহির প্রশ্নটি এখন কার কাছে
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দায়িত্ব রোগের নজরদারি, চিকিৎসা-প্রস্তুতি ও তথ্যের মান বজায় রাখা। সিটি করপোরেশন ও অন্য স্থানীয় সরকার সংস্থার দায়িত্ব পরিবেশগত ঝুঁকি কমানো এবং নাগরিক সেবার প্রতিকার। স্থানীয় সরকার বিভাগের দায়িত্ব এই কাজগুলোতে সমন্বয়, সম্পদ ও মানদণ্ড নিশ্চিত করা। দায়িত্ব আলাদা বলেই একটি যৌথ ফল-পাতা দরকার; না হলে রোগী বাড়লে স্বাস্থ্য দপ্তর সংখ্যা বলবে, আর স্থানীয় সংস্থা কর্মসূচির কথা বলবে, কিন্তু মাঝখানের ফল কেউ মিলিয়ে দেখবে না।
নাগরিকেরও প্রশ্ন করার অধিকার ও দায় আছে। পানি জমার স্থান দেখলে প্রতিবেশী, বাড়ির মালিক, নির্মাণকাজের তত্ত্বাবধায়ক বা ওয়ার্ড কাউন্সিলরকে জানানো দরকার। কিন্তু ‘নাগরিককে সচেতন হতে হবে’ বাক্যটি প্রশাসনিক জবাবদিহির বিকল্প নয়। নাগরিক সহযোগিতা চাইলে অভিযোগ জানানোর সহজ পথ, প্রতিকারের সময়সীমা, এবং কাজ হয়েছে কি না যাচাইয়ের উপায়ও দিতে হবে।
ছয়টি প্রশ্নের প্রকাশ্য উত্তর চাই
- ডিএসসিসির জরিপে যে প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়িতে লার্ভা পাওয়া গেছে, তার ওয়ার্ডভিত্তিক বণ্টন ও জরিপের সময়সীমা কী?
- সর্বোচ্চ ঝুঁকির ওয়ার্ডগুলোতে গত সাত দিনে কতটি প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করা হয়েছে, এবং পুনঃপরিদর্শনে ফল কী?
- দুই সিটি করপোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মধ্যে দৈনিক কোন তথ্য ভাগ হয় এবং কোন কর্মকর্তা তা সমন্বয় করেন?
- হাসপাতালে ভর্তি বাড়লে শয্যা, পরীক্ষা, চিকিৎসক-নার্স ও রক্ত-উপাদানের সক্ষমতা কীভাবে বাড়ানো হচ্ছে?
- নাগরিকের অভিযোগ গ্রহণ ও প্রতিকারের গড় সময় কত, এবং কোন এলাকাগুলোতে একই অভিযোগ বারবার আসছে?
- পরবর্তী সাত দিনে কোন সূচক কমলে সরকার বলবে যে সমন্বিত অভিযান কাজ করছে, আর না কমলে কী সংশোধন হবে?
এগুলো তদন্তে দোষী সাব্যস্ত করার প্রশ্ন নয়। এগুলো এমন প্রশাসনিক প্রশ্ন, যার উত্তর থাকলে সরকার দেখাতে পারবে কোথায় কাজ হচ্ছে, কোথায় ঘাটতি, আর কী সংশোধন দরকার। উত্তর না থাকলে একই সমস্যা প্রতি বর্ষায় নতুন করে সংবাদ হয়, কিন্তু শেখার ব্যবস্থা তৈরি হয় না।
শেষ কথা
এক দিনে ১,৫৫৮ ভর্তি ও চার মৃত্যু কোনো সাধারণ দৈনিক সংখ্যা নয়। এটি আতঙ্ক ছড়ানোর অজুহাতও নয়; বরং এমন একটি মুহূর্ত, যখন তথ্যকে কর্মফলের সঙ্গে জোড়া যায়। ডিএসসিসির প্রশাসক ঠিকই বলেছেন—কেবল কীটনাশক যথেষ্ট নয় এবং নাগরিক অংশগ্রহণ দরকার। এখন সেই কথাকে বাস্তব প্রশাসনে পরিণত করতে হবে: ঝুঁকির মানচিত্র, দ্রুত প্রতিকার, পুনঃপরিদর্শন, হাসপাতাল প্রস্তুতি এবং ওয়ার্ডভিত্তিক প্রকাশ্য ফল। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য লড়াইয়ের প্রমাণ ঘোষণায় নয়, পরের সপ্তাহের যাচাইযোগ্য ফলাফলে।
তথ্যসূত্র
- স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস), হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টারের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ড; ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত দৈনিক ভর্তি, মৃত্যু ও মোট রোগীর সরকারি তথ্য
- দ্য ডেইলি স্টার, ‘Four die as dengue hospitalisations hit record daily high’, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬; ডিজিএইচএসের ১,৫৫৮ ভর্তি, ৪ মৃত্যু ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যার স্বাধীন প্রতিবেদন
- প্রথম আলো, ‘ডেঙ্গুতে এক দিনে আক্রান্তের রেকর্ড, মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত অভিযানের নির্দেশ’, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬; ডিএসসিসির প্রশাসকের নির্দেশ ও লার্ভা জরিপের তথ্য
