NCP Diaspora Alliance GermanyNCP Diaspora Alliance Germanyমূল ওয়েবসাইট →

ব্যাংকিং ও জবাবদিহি

বড় ঋণগ্রহীতাকে দীর্ঘ অবকাশ: ফলের হিসাব প্রকাশ করবে কি বাংলাদেশ ব্যাংক?

সম্পাদকীয় ডেস্ক · ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনের আবেদনের সময় বাড়িয়েছে। বড় ঋণের ক্ষেত্রে ১৫ বছর পর্যন্ত মেয়াদ মিলতে পারে; তাই এখন দরকার সুবিধাভোগী, আদায় ও খেলাপি-ঝুঁকির প্রকাশ্য হিসাব।

ব্যাংক ঋণ, পুনর্গঠন ও জনজবাবদিহির প্রতীকী সম্পাদকীয় চিত্র

NCP Diaspora Alliance Germany-এর সম্পাদনা–বিশ্লেষণ চিত্র; এটি কোনো বাস্তব ঘটনার ছবি নয়।

সংক্ষেপে

বাংলাদেশ ব্যাংক ৩১ আগস্ট ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা ও আর্থিক অবস্থা পুনর্গঠনের নীতিসহায়তার জন্য নতুন করে আবেদন করার সময় ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। যেসব ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর সংশ্লিষ্ট ঋণ ১,০০০ কোটি টাকা বা তার বেশি, তাদের ক্ষেত্রে বিশেষ পুনঃতফসিলের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫ বছর—এর মধ্যে সর্বোচ্চ দুই বছর কিস্তি-অবকাশ—হতে পারে। বিশেষ পুনর্গঠনে ২০২২ সালের সাধারণ নিয়মের বাইরে আরও সর্বোচ্চ চার বছর যোগ হতে পারে।

ব্যবসা টিকিয়ে রাখা, কর্মসংস্থান রক্ষা এবং ব্যাংকের আদায় বাড়ানো—এই তিনটি উদ্দেশ্যে সাময়িক ছাড় কখনো যুক্তিসঙ্গত হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদ, আগের সুবিধাভোগীর আবার আবেদন এবং বড় ঋণের জন্য আলাদা ব্যবস্থা একসঙ্গে এলে জনস্বার্থের আরেকটি প্রশ্নও জোরালো হয়: কোন প্রতিষ্ঠানের বাস্তব পুনরুদ্ধার সম্ভব, কত টাকা ফেরত আসছে, আর কত ঝুঁকি শুধু ভবিষ্যতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে? বাংলাদেশ ব্যাংক এখন সুবিধার ঘোষণা দিয়েছে; জবাবদিহির পরীক্ষা হবে ফলের তথ্য প্রকাশে।

সরকার কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১-এর ৩১ আগস্টের সার্কুলার লেটার নং ৩০ বিদ্যমান নীতিসহায়তার মেয়াদ বাড়িয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ইংরেজি সার্কুলার সূচি এবং বাংলা মূল নির্দেশ—দুটিই দেখায় যে এটি নতুন আইন নয়; ২০২৫ সালের সার্কুলার নং ৭, পরের নির্দেশনা এবং ২০২২ সালের পুনর্গঠন-নিয়মের অধীনে একটি কার্যকর নীতিগত সম্প্রসারণ। নির্দেশটি ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ধারা ৪৯(১)(চ)-এর ক্ষমতাবলে অবিলম্বে কার্যকর হয়েছে।

নতুন আবেদন ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে জমা দেওয়া যাবে। আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাচন কমিটি বা ২০২৫ সালের নীতির অধীনে সহায়তা পাওয়া ঋণগ্রহীতারাও আবার আবেদন করতে পারবেন। প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট নেওয়ার পর ব্যাংককে এই ব্যবস্থার আবেদন ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বলা হয়েছে। প্রকাশিত নির্দেশ ও একাধিক সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, অশ্রেণিকৃত ঋণ বিশেষ পুনর্গঠনের এবং শ্রেণিকৃত ঋণ বিশেষ পুনঃতফসিলের সুযোগ পেতে পারে; আগের নিয়ম ও শর্তগুলো বহাল থাকে।

এখানে শব্দ দুটির পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। পুনঃতফসিল সাধারণত পুরোনো ঋণ পরিশোধের সময়সূচি বদলায়; পুনর্গঠন আরও বিস্তৃত আর্থিক বা ব্যবসায়িক ব্যবস্থার পরিবর্তন হতে পারে। সার্কুলারটি সব ঋণখেলাপিকে এককভাবে ‘মওকুফ’ দেয়নি, কোনো ঋণের তালিকাও প্রকাশ করেনি। তাই এই লেখা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধাভোগী বলে চিহ্নিত করছে না।

সরকারের যুক্তি কী?

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্যের শক্তিশালী দিকটি আগে দেখা দরকার। তার সাম্প্রতিক আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ নীতিসহায়তার উদ্দেশ্য ছিল সাময়িক ধাক্কায় ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু টিকে ওঠার সম্ভাবনা থাকা ঋণগ্রহীতাকে সহায়তা করা, বকেয়া আদায় ত্বরান্বিত করা এবং ব্যাংক খাতের স্থিতি রক্ষা করা। ৩১ আগস্টের সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা বলেছে, ব্যবসা ও আর্থিক অবস্থা যথাযথভাবে পুনর্গঠন এবং নীতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই সময় বাড়ানোর উদ্দেশ্য।

এই যুক্তি অযৌক্তিক নয়। উৎপাদন বন্ধ হলে শ্রমিকের আয়, সরবরাহকারী, কর আদায় এবং ব্যাংকের জামানত—সবই চাপের মুখে পড়ে। কোনো কার্যকর প্রতিষ্ঠানকে হঠাৎ দেউলিয়া করে দেওয়ার বদলে যাচাই করা পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা ব্যাংকের জন্যও ভালো ফল দিতে পারে। প্রোথোম আলোর প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতিতে গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতিতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়া বড় শিল্পের কথা এসেছে। তবে কর্মকর্তার ব্যাখ্যা এবং সার্কুলারের সর্বজনীন বিধান এক জিনিস নয়; প্রত্যেক আবেদনে কার্যকারিতা প্রমাণের আলাদা পরীক্ষা দরকার।

সমস্যাটা কোথায়?

প্রথম প্রশ্নটি সমতার। ১,০০০ কোটি টাকা বা তার বেশি ঋণের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ বছর এবং সর্বোচ্চ দুই বছর অবকাশের উল্লেখ আছে; এর নিচের ঋণের ক্ষেত্রে পুরোনো মেয়াদ প্রযোজ্য। বড় প্রতিষ্ঠান অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে—এটাই সরকারের যুক্তি হতে পারে। কিন্তু ছোট ও মাঝারি ঋণগ্রহীতা কী শর্তে, কত দ্রুত এবং কী অনুপাতে একই ধরনের পুনরুদ্ধার-সুযোগ পাচ্ছেন, সেই তুলনামূলক তথ্য প্রকাশ না হলে নীতির ন্যায্যতা যাচাই করা যায় না।

দ্বিতীয় প্রশ্নটি পুনরাবৃত্তি। সার্কুলার আগের নীতিসহায়তাপ্রাপ্তদেরও নতুন আবেদনের সুযোগ দিয়েছে। এটি সত্যিকারের দীর্ঘমেয়াদি ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার পথ হতে পারে। আবার ভুল যাচাই, অতিরিক্ত আশাবাদী ব্যবসায়িক পরিকল্পনা বা দুর্বল আদায়-পর্যবেক্ষণ থাকলে একই ঋণের ঝুঁকি বারবার পিছিয়ে দেওয়ার পথও খুলতে পারে। কোনো একটি ব্যাখ্যাকে প্রমাণ ছাড়া সত্য ধরে নেওয়া যাবে না। তাই নাম প্রকাশ না করেও খাতভিত্তিক ‘কত আবেদন, কত অনুমোদন, কত আদায়, কত আবার খেলাপি’—এই চারটি সূচক প্রকাশ জরুরি।

তৃতীয় প্রশ্নটি তথ্যের। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকাশিত নির্দেশে যোগ্য প্রতিষ্ঠানের নাম, ঋণের পরিমাণ, ছাড়ের ধরন, পরিশোধ সূচি বা পুনরুদ্ধার লক্ষ্যমাত্রার কোনো প্রকাশ্য তালিকা নেই। গোপনীয়তা ও বাণিজ্যিক সংবেদনশীলতার কারণ থাকতে পারে। কিন্তু সমষ্টিগত তথ্য প্রকাশে সেই বাধা কম: ব্যাংক ও খাতভিত্তিক সংখ্যা, ঋণের আকার-ভিত্তিক অনুমোদন, ডাউন পেমেন্ট আদায় এবং খেলাপি অবস্থার পরিবর্তন প্রকাশ করলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ভাঙবে না; নীতির ফল মাপা যাবে।

তথ্য কী বলছে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৫ শেষে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের স্থিতি ছিল ১,৭০৫.০৩ বিলিয়ন টাকা, অর্থাৎ প্রায় ১.৭১ লাখ কোটি টাকা; ২০২৪ সালে তা ছিল ৮৫৬.৭৯ বিলিয়ন টাকা। একই প্রতিবেদনে পুনঃতফসিলকৃত ঋণের অনুপাত ২০২৫ সালে ২৪.৫৪ শতাংশ বলা হয়েছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ২০.৩৬ শতাংশ। এগুলো ২০২৫ সালের প্রতিবেদনভুক্ত তথ্য—এ সিদ্ধান্তের পরের ফল নয়। তবু এগুলো দেখায়, পুনঃতফসিল এখন ব্যাংক খাতের প্রান্তিক বিষয় নয়।

আরেকটি প্রাসঙ্গিক তুলনা আছে। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জানায়, প্রথম নয় মাসে প্রায় ৩০০ প্রতিষ্ঠান প্রায় ২ লাখ কোটি টাকার পুনঃতফসিল বা পুনর্গঠনের জন্য আবেদন করেছিল; ১,৫১৬ আবেদনের মধ্যে ৯০০টির নিষ্পত্তি হয়েছিল এবং প্রায় ২৬,১১৪ কোটি টাকার ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়। এই পুরোনো তথ্য বর্তমান সুবিধার পরিমাণ বা অনুমোদন প্রমাণ করে না। কিন্তু আগের কর্মসূচির ফলাফল কেন নিয়মিত প্রকাশ করা দরকার, তার বাস্তব পটভূমি দেয়।

কোন তথ্য প্রকাশ হলে হিসাব মেলবে?

একটি ভালো নীতির পরীক্ষায় শুধু আবেদন গ্রহণের সংখ্যা যথেষ্ট নয়। প্রথমে জানা দরকার, কতটি আবেদন অশ্রেণিকৃত এবং কতটি শ্রেণিকৃত ঋণের জন্য; কতটি ব্যাংক আবেদন পেয়েছে; কতটি যাচাই শেষে বাতিল হয়েছে; আর অনুমোদিত ঋণের কতটা ১,০০০ কোটি টাকার বেশি। এরপর দরকার শর্তের সারাংশ: গড় ডাউন পেমেন্ট, গড় মেয়াদ, গড় অবকাশ এবং পুনর্গঠনের সময়ে নতুন ঋণ বা সুদ-ছাড়ের কোনো শর্ত আছে কি না। এসব তথ্য ব্যক্তি বা কোম্পানির নাম ছাড়া সমষ্টিগত আকারে প্রকাশ করা সম্ভব।

তারপর ফল মাপতে হবে একই ধারাবাহিকতায়। অনুমোদনের ছয় মাস ও বারো মাস পরে নির্ধারিত কিস্তির কত ভাগ আদায় হলো, কত ঋণ আবার শ্রেণিকৃত হলো, এবং ব্যাংকগুলো কত প্রভিশন রেখেছে—এই তিনটি সূচক ছাড়া ‘পুনরুদ্ধার’ শব্দটির বাস্তব অর্থ বোঝা কঠিন। বড় ঋণগ্রহীতার দীর্ঘ মেয়াদ নিজে ভালো বা খারাপের প্রমাণ নয়। তবে তথ্য না থাকলে জনগণ জানবে না এটি কর্মসংস্থান রক্ষার একটি সফল সেতু, নাকি পুরোনো ঝুঁকিকে দীর্ঘতর কিস্তিতে লুকিয়ে রাখার ব্যবস্থা।

এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য আরেকটি বাস্তব সুযোগ আছে। প্রতিটি অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের কাছে ঋণের শ্রেণি, কিস্তি, আদায় ও প্রভিশনের তথ্য এমনিতেই থাকে। নির্ধারিত একটি একক ছকে মাসিক তথ্য নিয়ে প্রকাশ করলে সাংবাদিক, সংসদীয় কমিটি, আমানতকারী ও ব্যবসায়ী—সবাই একই মাপকাঠিতে ফল দেখতে পারবেন। এতে কোনো ব্যাংকের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তে অযথা হস্তক্ষেপ হবে না; বরং কোন প্রতিষ্ঠানে নীতিসহায়তা সত্যিই কাজ করছে এবং কোথায় দ্রুত সংশোধন দরকার, তা আগেই ধরা ও সময়মতো সংশোধন করা সম্ভব হবে।

প্রকাশের ভাষাও পরিষ্কার হওয়া দরকার। ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ বলতে কোন ধরনের আঘাত বোঝানো হচ্ছে—জ্বালানি-ঘাটতি, রপ্তানি-অর্ডার কমা, বিনিময় হার, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নাকি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা—তার শ্রেণিবিন্যাস থাকলে ব্যাংকের সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করা যাবে। একই সঙ্গে অনুমোদনের আগে স্বাধীন মূল্যায়ন হয়েছে কি না, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বা ঋণ-কমিটির কী ভূমিকা, এবং সুবিধা নেওয়ার পর লভ্যাংশ, সম্পর্কিত পক্ষকে লেনদেন বা নতুন বড় ঋণের ক্ষেত্রে কী নিয়ন্ত্রণ থাকবে—এসব নীতিগত নিরাপত্তা সমষ্টিগতভাবে জানানো যেতে পারে। তাতে প্রকৃত উদ্যোক্তাকে সহায়তা এবং কৃত্রিমভাবে টিকিয়ে রাখা ঋণ—দুটিকে এক পাল্লায় ফেলার ঝুঁকি কমে।

আগের বছরগুলোর সঙ্গে তুলনা

২০২৫-এর বিশেষ নীতি সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও সম্ভাবনাময় ঋণগ্রহীতাকে আলাদা করে দেখার ধারণা চালু করেছিল। বর্তমান সিদ্ধান্ত সেই ধারাই বাড়াল: আবেদন-সময় ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, নিষ্পত্তির সময় ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত, এবং বড় ঋণে দীর্ঘ মেয়াদের নির্দিষ্ট সুযোগ। ফলে এটি একেবারে নতুন দিকবদল নয়; বরং আগের নীতির সম্প্রসারণ ও সমন্বয়। সেই কারণে আগের সুবিধা থেকে কত টাকা নিয়মিত হয়েছে, কতটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন বা কর্মসংস্থান ধরে রেখেছে এবং কতটি ঋণ আবার সমস্যায় পড়েছে—এই তুলনাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আগের সরকারের সময়ের সঙ্গে সরল রাজনৈতিক তুলনা এখানে সহায়ক হবে না। ঋণখেলাপি, বিনিময় হার, জ্বালানি-সরবরাহ ও বৈশ্বিক বাজারের চাপ বহু বছরের এবং নানা কারণের ফল। সৎ তুলনা হবে একই নীতির আগে ও পরে: অনুমোদিত ঋণের আদায়, নতুন খেলাপি, প্রভিশন, কর্মসংস্থান এবং ব্যাংকের মূলধন-চাপ। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য এটিই বাস্তব হিসাব।

কার লাভ, কার ঝুঁকি?

সত্যিকারভাবে টিকতে পারে এমন প্রতিষ্ঠান সময় পেলে শ্রমিক, সরবরাহকারী ও স্থানীয় অর্থনীতি উপকৃত হতে পারে। ব্যাংকও একবারে ক্ষতি স্বীকারের বদলে নগদ আদায়ের সুযোগ পেতে পারে। অন্যদিকে, যদি ব্যবসার বাস্তব পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা দুর্বল হয়, দীর্ঘ অবকাশে সুদ ও মূলধনের ঝুঁকি জমতে পারে। তখন আমানতকারী, ছোট ঋণগ্রহীতা, ব্যাংকের শেয়ারধারী এবং শেষ পর্যন্ত সরকারি সহায়তার সম্ভাব্য দায় বহনকারী জনসাধারণ পরোক্ষভাবে ঝুঁকিতে থাকেন। এটি নিশ্চিত ক্ষতির দাবি নয়; ঝুঁকির চ্যানেলটি স্বীকার করা।

সরকারের যুক্তি কতটা টেকে?

যুক্তিটি টিকবে যদি সহায়তা ‘সময় কিনে দেওয়া’তে আটকে না থেকে যাচাইযোগ্য পুনরুদ্ধারে পরিণত হয়। এর জন্য ব্যাংককে ঋণগ্রহীতার নগদ প্রবাহ, জ্বালানি ও বাজার-ঝুঁকি, জামানত, কর-অনুগততা এবং পরিচালন সক্ষমতা পরীক্ষা করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত তদারকিও দরকার। শুধু ঋণকে নতুন নামে দীর্ঘ করা হলে খেলাপি অনুপাত সাময়িকভাবে কম দেখাতে পারে, কিন্তু প্রকৃত আদায় না বাড়লে সমস্যা থাকে। আবার যথাযথ যাচাইসহ পুনর্গঠন ব্যর্থ ব্যবসা বন্ধ না করে উৎপাদন চালু রাখতে পারে। ফলের আগেই কোনটি ঘটেছে বলা যাবে না।

বড় ছবিটা কী?

এই সিদ্ধান্তের কেন্দ্র শুধু বড় ঋণগ্রহীতা নয়, ব্যাংকিং নীতির দৃশ্যমানতা। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি মাসে একটি সমষ্টিগত ড্যাশবোর্ড প্রকাশ করতে পারে: আবেদন ও অনুমোদনের সংখ্যা, ঋণের আকার ও খাত, গড় ডাউন পেমেন্ট, পুনঃতফসিলের পর ছয় ও বারো মাসের কিস্তি-আদায়, আবার শ্রেণিকৃত হওয়া ঋণ এবং ব্যাংকভিত্তিক প্রভিশন। কোনো গ্রাহকের ব্যক্তিগত পরিচয় ছাড়াই এমন তথ্য দেওয়া সম্ভব।

সংসদের অর্থ-সম্পর্কিত কমিটি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ও ব্যাংক থেকে সংগৃহীত একই তথ্যের ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা চাইতে পারে। ১,০০০ কোটি টাকার বেশি ঋণের সুবিধার ক্ষেত্রে কার্যকারিতা মূল্যায়নের ন্যূনতম প্রকাশ্য সারাংশ থাকা উচিত—কত কর্মসংস্থান টিকল, কত উৎপাদন ফিরল, এবং নির্ধারিত কিস্তি কতটা আদায় হলো। এতে বাণিজ্যিক গোপনীয়তা রক্ষা করেও নীতির ব্যতিক্রমী সুবিধার জবাবদিহি করা যায়।

উপসংহার

ক্ষতিগ্রস্ত কিন্তু কার্যকর ব্যবসাকে দ্বিতীয় সুযোগ দেওয়া অর্থনীতির জন্য ভুল নাও হতে পারে। ভুল হবে তখন, যখন দ্বিতীয় সুযোগের ফল কেউ মাপবে না। ৩১ আগস্টের সার্কুলার বড় ঋণের জন্য সময়ের পরিসর বাড়িয়েছে; এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব সেই সময়ের বদলে কী আদায়, কী উৎপাদন, কী কর্মসংস্থান ও কী কম ঝুঁকি পাওয়া গেল—তার প্রকাশ্য উত্তর দেওয়া। সুবিধার দরজা খোলার সঙ্গে ফলের খাতাও খোলা থাকলেই নীতিটি আস্থা পাবে।

তথ্যসূত্র

  1. বাংলাদেশ ব্যাংক: BRPD-1 সার্কুলার লেটার নং ৩০, নীতিসহায়তা ও পুনর্গঠন (৩১ আগস্ট ২০২৬)
  2. বাংলাদেশ ব্যাংক: ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫, পুনঃতফসিলকৃত ঋণ অংশ
  3. প্রথম আলো ইংরেজি: বড় ঋণখেলাপির পুনঃতফসিল ও অবকাশের শর্ত (৩১ আগস্ট ২০২৬)
  4. ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস: পুনঃতফসিল-পুনর্গঠন বিধি শিথিলের প্রতিবেদন (১ সেপ্টেম্বর ২০২৬)
  5. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: সময় বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ও শর্তের সারাংশ (৩১ আগস্ট ২০২৬)
  6. দ্য ডেইলি স্টার: ২০২৫ সালের পুনঃতফসিল আবেদনের সংখ্যা ও নিষ্পত্তির প্রতিবেদন (৭ ডিসেম্বর ২০২৫)