NCP Diaspora Alliance GermanyNCP Diaspora Alliance Germanyমূল ওয়েবসাইট →

জ্বালানি জবাবদিহি

বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের এক ইউনিট ফের চালু, কিন্তু পাঁচ বছরের বন্ধ ইউনিটের প্রকাশ্য হিসাব কোথায়?

সম্পাদকীয় ডেস্ক · ১৬ আগস্ট ২০২৬

এক দিনের মেরামতে ইউনিট ১ আবার বিদ্যুৎ দিচ্ছে। অথচ একই কেন্দ্রের ইউনিট ২ বন্ধ ২০২০ সাল থেকে। সেটি মেরামত হবে, বদলানো হবে, নাকি অবসরে যাবে—খরচ ও সময়সীমাসহ কোনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে নেই।

জনস্বার্থ, নথি ও জবাবদিহির প্রতীকী সম্পাদকীয় চিত্র

NCP Diaspora Alliance Germany-এর সম্পাদনা–বিশ্লেষণ চিত্র; এটি কোনো বাস্তব ঘটনার ছবি নয়।

বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইউনিট ১ এক দিনের মেরামতে আবার চালু হয়েছে—এটি স্বস্তির খবর। কিন্তু একই কেন্দ্রের ১২৫ মেগাওয়াটের ইউনিট ২ বন্ধ পড়ে আছে ২০২০ সাল থেকে। পাঁচ বছর পরও প্রশ্নটি একই: মেরামত, প্রতিস্থাপন নাকি অবসান—সরকার কোন পথে যাচ্ছে, কত খরচ হবে এবং কাজ শেষ হবে কবে?

বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ১৫ আগস্ট যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামতের পর ইউনিট ১ জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৫৫ মেগাওয়াট দেওয়া শুরু করে। একই প্রতিবেদনে ইউনিট ৩-এর সরবরাহ প্রায় ১৭০ মেগাওয়াট বলা হয়েছে। আর ইউনিট ২? সেটি ২০২০ সাল থেকেই অচল। এই পাঁচ বছরের নীরবতাই জবাবদিহির মূল প্রশ্ন।

একটি ইউনিট চালু মানেই কেন্দ্র স্বাভাবিক নয়

১৫ আগস্ট বাসসের হিসাবে ইউনিট ১-এর নকশাগত সক্ষমতা ১২৫ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ ছিল ৫৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ উৎপাদন পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি; মেরামতের পর আংশিক সরবরাহ ফিরেছে। ইউনিট ৩-এর ক্ষেত্রেও ২৭৫ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিপরীতে সরবরাহ ছিল প্রায় ১৭০ মেগাওয়াট। তাই নামফলকে কত লেখা আছে আর বাস্তবে গ্রিডে কত যাচ্ছে—দুটি হিসাব আলাদা করে জানানো জরুরি।

এ কারণে বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রতিটি ওঠানামাকে জাতীয় বিদ্যুৎ-সংকটের একমাত্র কারণ বলা ঠিক হবে না। বিপিডিবির ১৪ জুনের দৈনিক প্রতিবেদনে সন্ধ্যা-চূড়ায় ১,৫১৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং এবং একাধিক কেন্দ্রের অনুপলব্ধতার তথ্য ছিল। সেটি একটি দিনের সিস্টেম-চিত্র, কারণ নির্ধারণের প্রমাণ নয়। তবে এমন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অচল সরকারি সম্পদ আরও বেশি প্রশ্নের দাবি রাখে।

ইউনিট ২ পাঁচ বছর বন্ধ—এত দিনে কী হয়েছে?

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ২ মে জানায়, বড় ধরনের বিপর্যয়ের পর ইউনিট ২ ২০২০ সাল থেকে পুরোপুরি বন্ধ। তখন ইউনিট ৩-ও বড় মেরামতের জন্য বন্ধ ছিল; ইউনিট ১ মেরামতের পর আংশিক উৎপাদনে ফিরেছিল। ১৫ আগস্টের বাসস প্রতিবেদনেও কর্তৃপক্ষ বলেছে, ইউনিট ২ চালুর ‘উদ্যোগ’ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই উদ্যোগ কি সমীক্ষা, দরপত্র, চুক্তি, যন্ত্রাংশ কেনা, নাকি পুরো ইউনিট বদলানোর সিদ্ধান্ত—প্রকাশিত তথ্য থেকে তা বোঝার উপায় নেই।

এটি প্রশাসনিক খুঁটিনাটি নয়। পুরোনো ইউনিট মেরামত করা লাভজনক কি না, নতুন ইউনিট ভালো বিকল্প কি না, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতার ঝুঁকি কতটা, আর কয়লাভিত্তিক এই সম্পদ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় থাকবে কি না—প্রতিটি সিদ্ধান্তের সঙ্গে জনঅর্থ, বিদ্যুতের দাম ও সরবরাহ জড়িত। সিদ্ধান্ত না নেওয়াও একটি সিদ্ধান্ত: সম্পদ অচল পড়ে থাকে, আর অনিশ্চয়তার খরচ দেয় পুরো ব্যবস্থা।

সংকট পুরোনো—আজকের দায়টা কোথায়?

বর্তমান সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে দুর্বল বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত পেয়েছে—বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ২৮ জুন সংসদে বহু বছরের অব্যবস্থাপনা ও বকেয়া দায়ের কথা বলেছেন। তিনি একই সঙ্গে জ্বালানি অনুসন্ধান, সঞ্চালন আধুনিকায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার পরিকল্পনার কথা বলেছেন। এই প্রেক্ষাপট গুরুত্বপূর্ণ: পাঁচ বছরের পুরোনো যান্ত্রিক ত্রুটিকে বর্তমান সরকারের সৃষ্টি বলা ন্যায্য হবে না।

উত্তরাধিকার সংকটের ব্যাখ্যা দিতে পারে, অনির্দিষ্ট অপেক্ষার নয়। মন্ত্রী ৭ জুন সংসদে বলেছেন, পরিকল্পিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে বড় কেন্দ্রগুলোকে সর্বোচ্চ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রই সেই দাবির বাস্তব পরীক্ষা। ইউনিট ১ দ্রুত চালু করা সক্ষমতার পরিচয় দেয়; ইউনিট ২ নিয়ে প্রকাশ্য কোনো মাইলফলক না থাকা দেখায়, কাজটি এখনো অসম্পূর্ণ।

চারটি তথ্য প্রকাশ করলেই হিসাব পরিষ্কার হবে

এখন আর ‘উদ্যোগ’ শব্দটি যথেষ্ট নয়

ইউনিট ১ চালু হওয়ায় উত্তরাঞ্চলসহ জাতীয় গ্রিড কিছু বাড়তি বিদ্যুৎ পেয়েছে—এই সাফল্য স্বীকার করা উচিত। কিন্তু একটি কেন্দ্রকে বছরের পর বছর আংশিক সক্ষমতায় চালানো স্বাভাবিক হতে পারে না। পুরোনো ত্রুটির দায় নিয়ে রাজনৈতিক বাক্যবিনিময়ের চেয়ে জরুরি হলো ইউনিট ২ নিয়ে খরচ, সক্ষমতা ও সময়রেখাসহ যাচাইযোগ্য সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা। তাহলেই বোঝা যাবে সরকারের ‘প্রস্তুতি’ শুধু বক্তব্যে আছে, নাকি সম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও।

সম্পাদকীয় নোট: এই বিশ্লেষণটি ১৬ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশ্য সরকারি দৈনিক প্রতিবেদন, রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ও প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। ইউনিট ২-এর মেরামত বা প্রতিস্থাপনসংক্রান্ত কোনো চূড়ান্ত সরকারি চুক্তি, ব্যয় বা সময়সীমা আমরা প্রকাশ্য উৎসে নিশ্চিত করতে পারিনি; তাই লেখাটি সেই তথ্য প্রকাশের দাবি পর্যন্ত সীমিত।

তথ্যসূত্র

  1. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ইউনিট ১ পুনরায় উৎপাদনে—১৫ আগস্ট ২০২৬
  2. বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড: ১৪ জুন ২০২৬-এর দৈনিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও অনুপলব্ধ ইউনিটের প্রতিবেদন
  3. বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: মেরামতের পর বড়পুকুরিয়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে গ্রিডে সরবরাহ; ইউনিট ২ ২০২০ থেকে বন্ধ—২ মে ২০২৬
  4. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: বিদ্যুৎ চাহিদা সামলাতে সরকারের প্রস্তুতি বিষয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রীর সংসদীয় বক্তব্য—৭ জুন ২০২৬
  5. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: জ্বালানি খাতের উত্তরাধিকার, দায় ও পুনর্গঠন পরিকল্পনা বিষয়ে বিদ্যুৎমন্ত্রীর বক্তব্য—২৮ জুন ২০২৬
  6. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: বর্তমান সরকার ও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব বণ্টনের সরকারি গেজেট-ভিত্তিক সংবাদ—১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬