ফোন, গাড়ি, চিকিৎসা যন্ত্র, ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎব্যবস্থা কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—সবকিছুর ভেতরেই চিপ আছে। WSTS-এর সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার প্রায় ১.৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তাই বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন ‘চিপ গুরুত্বপূর্ণ কি না’ নয়। আসল প্রশ্ন হলো, এই বিশাল কিন্তু জটিল শিল্পের কোন অংশে আমরা বাস্তবে ভালো করতে পারি।
বাংলাদেশ শূন্য থেকে শুরু করছে না
BIDA-এর হিসাবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ৮ মিলিয়ন ডলারের বেশি সেমিকন্ডাক্টর পণ্য ও সেবা রপ্তানি করেছে। দেশে চিপ ডিজাইনার ৭০০-এর বেশি; CSE ও EEE থেকে বছরে স্নাতক হন ২০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী। আবার ২০২৬ সালের জুলাইয়ে The Daily Star-এ প্রকাশিত শিল্পখাতের হিসাবে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ১,২০০ প্রকৌশলী কাজ করেন এবং বার্ষিক খাত-রাজস্ব ১২–১৫ মিলিয়ন ডলার। দুটি হিসাবের বছর ও মাপকাঠি এক নয়—একটি রপ্তানি, অন্যটি বিস্তৃত শিল্প-রাজস্ব। তবে দুটিই একই ছবি দেখায়: খাতটি ছোট, কিন্তু আর শূন্য নয়।
সক্ষমতার বাস্তব উদাহরণও আছে। ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত Ulkasemi এখন চারটি আন্তর্জাতিক ডিজাইন সেন্টারে ৬০০-এর বেশি প্রকৌশলী নিয়োজিত থাকার কথা জানায় এবং ২০২১ সাল থেকে TSMC Design Center Alliance-এর অংশীদার। Neural Semiconductor-এর প্রকৌশলী সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে BUET-এর ওপেন-সোর্স ৩২-বিট RISC-V প্রসেসর Pragati v1 সফল tape-out-এর পর fabricated chip হাতে পেয়েছে। এগুলো এখনো গণশিল্প নয়, কিন্তু বিশেষায়িত প্রকৌশল কাজ সম্পন্ন করার সক্ষমতা প্রমাণ করে।
কেন ডিজাইন দিয়ে শুরু করাই বাস্তবসম্মত
অত্যাধুনিক চিপ তৈরির কারখানায় কয়েক দশ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ লাগতে পারে। সঙ্গে চাই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, অতি বিশুদ্ধ পানি, বিশেষ রাসায়নিক এবং পরিণত সরবরাহব্যবস্থা। বাংলাদেশের সেই ভিত্তি এখনো নেই। বিপরীতে চিপ ডিজাইন ও যাচাই মূলধনের চেয়ে জ্ঞাননির্ভর। এরপর আন্তর্জাতিক মান, সনদ ও সরবরাহের শর্ত পূরণ করা গেলে অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং, মার্কিং ও প্যাকেজিং—অর্থাৎ OSAT বা ATMP—পরবর্তী ধাপ হতে পারে।
ধাপভিত্তিক কৌশল জনগণের অর্থের ঝুঁকিও কমায়। প্রথমে IC design, analogue ও RF layout, verification, embedded systems, RISC-V গবেষণা এবং test engineering গভীর করা যায়; এরপর shared laboratory ও আন্তর্জাতিকভাবে certified pilot packaging facility। স্বাধীন feasibility study-তে নির্ভরযোগ্য demand, infrastructure, partner ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রমাণিত হলেই fabrication প্রকল্প বিবেচনা করা উচিত।
এক বিলিয়ন ডলার: পূর্বাভাস নয়, একটি কঠিন লক্ষ্য
BIDA ও শিল্প সংগঠনগুলো ২০২৪ সালের ৮ মিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানিকে ২০৩০ সালে ১ বিলিয়নে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে। ছয় বছরে এটি প্রায় ১২৫ গুণ বৃদ্ধি। এই লক্ষ্য অর্জনে একাধিক বড় design centre, দ্রুত অভিজ্ঞ technical leadership তৈরি, export client এবং কার্যকর testing বা packaging facility দরকার। বার্ষিক milestone ছাড়া শুধু শিরোনামটি প্রকাশ করলে শিল্পকৌশল স্লোগানে পরিণত হবে।
সরকারের একটি অভিন্ন পরিমাপব্যবস্থা প্রকাশ করা দরকার: আসলে কত প্রকৌশলী এই খাতে কাজ করছেন, মোট রাজস্বের কত অংশ রপ্তানি, প্রশিক্ষণ নেওয়া কতজন প্রাসঙ্গিক চাকরি পেয়েছেন, কত প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন করেছে এবং কত বেসরকারি বিনিয়োগ সত্যিই এসেছে। এই হিসাব না থাকলে সংজ্ঞা বদলে অগ্রগতির সুন্দর ছবি দেখানো যাবে, কিন্তু এক বছরের সঙ্গে আরেক বছরের ফল মিলিয়ে দেখা যাবে না।
নীতির ঘোষণা হয়েছে—এখন কাজের হিসাব চাই
ডিজাইন, পরীক্ষা ও অ্যাসেম্বলিকে অগ্রাধিকার দিয়ে BIDA-নেতৃত্বাধীন জাতীয় টাস্কফোর্স ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদন পায়। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে চিপ ডিজাইন, পরীক্ষা ও প্যাকেজিংয়ের উপকরণে শুল্ক-কর ছাড় ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে; সাধারণভাবে আমদানি শুল্ক রাখা হয়েছে ১ শতাংশ। নীতির ধারাবাহিকতার জন্য এটি ইতিবাচক। কিন্তু শিল্পপ্রতিষ্ঠান সরকারকে বিচার করবে অন্য হিসাবে—কাস্টমস ছাড়পত্র পেতে কত সময় লাগে, বৈধ EDA সফটওয়্যার ও সেমিকন্ডাক্টর মেধাস্বত্বে প্রবেশ আছে কি না, বিদ্যুৎ-ইন্টারনেট কতটা নির্ভরযোগ্য, গবেষণা অর্থায়ন কেমন এবং কাজের জন্য প্রস্তুত প্রকৌশলী তৈরি হচ্ছে কি না।
সাফল্য নির্ধারণ করবে যে পাঁচ পরীক্ষা
- দক্ষতা: VLSI, microelectronics ও verification curriculum আধুনিক করা; faculty training অর্থায়ন এবং industry-supervised paid internship বাধ্যতামূলক করা।
- টুলস: কঠোর cybersecurity ও ব্যবহারবিধিসহ বিশ্ববিদ্যালয় ও যোগ্য startup-এর জন্য আইনসম্মত licensed national EDA ও IP-access platform গড়া।
- অবকাঠামো: বিদ্যুৎ, উচ্চগতির সংযোগ, customs, specialist visa, laboratory এবং prototype import-এর জন্য পরিমাপযোগ্য service standard নির্ধারণ করা।
- মূলধন ও মান: certification, private co-investment, কর্মসংস্থান ও রপ্তানির যাচাইকৃত milestone-এর সঙ্গে যুক্ত করেই shared testing ও packaging facility অর্থায়ন করা।
- আস্থা: intellectual-property protection, data security, export-control compliance ও independent evaluation শক্তিশালী করা, যাতে বৈশ্বিক client সংবেদনশীল কাজ দিতে আস্থা পায়।
২০২৬–২০৩০: একটি ব্যবহারযোগ্য রোডম্যাপ
এক বছরের মধ্যে টাস্কফোর্সের পথনকশা, বাজেট, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও তিন মাস অন্তর অগ্রগতির হিসাব প্রকাশ করা উচিত। একই সময়ে যৌথ EDA ব্যবহারের ব্যবস্থা চালু করে অন্তত ১০টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্মসূচিকে শিল্পের চাহিদার সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে। পরের ধাপে দরকার বড় আকারের ডিজাইন প্রতিষ্ঠান, জাতীয় উৎকর্ষকেন্দ্র, আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত পরীক্ষাগার এবং বিশ্বাসযোগ্য বেসরকারি অংশীদারের সহায়তায় পরীক্ষামূলক ATMP বা OSAT স্থাপনা। প্রণোদনা ছাড়তে হবে প্রতিশ্রুতি শুনে নয়, যাচাই করা ফল দেখে।
প্রবাসী প্রকৌশলীরা অভিজ্ঞতার ঘাটতি দ্রুত কমাতে পারেন। জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, তাইওয়ান, জাপান ও অন্য সেমিকন্ডাক্টর-কেন্দ্রে থাকা বাংলাদেশিরা দলকে পরামর্শ, পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা, গবেষণাগারের সংযোগ এবং বৈশ্বিক ক্রয় ও মান নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারেন। শুধু নামের একটি উপদেষ্টা কমিটির চেয়ে যাচাই করা বিশেষজ্ঞ তালিকা ও নির্দিষ্ট সময়ের ভিজিটিং-ইঞ্জিনিয়ার কর্মসূচি বেশি কাজে দেবে।
রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত: প্রদর্শনী প্রকল্প, নাকি উৎপাদনশীল ইকোসিস্টেম?
বাংলাদেশে উচ্চাভিলাষী প্রযুক্তি ঘোষণার পরও টেকসই প্রতিষ্ঠান তৈরি না হওয়ার নজির আছে। সেমিকন্ডাক্টর কৌশলকে সেই পথ এড়াতে হবে। Taskforce ও দীর্ঘমেয়াদি fiscal incentive-এর জন্য সরকার কৃতিত্ব পেতে পারে; এখন বাস্তবায়নের জনপর্যবেক্ষণও মেনে নিতে হবে। গ্রাহক ও অবকাঠামোহীন ব্যয়বহুল প্রদর্শনী fab হবে দায়; হাজারো দক্ষ প্রকৌশলী, প্রতিযোগিতামূলক design firm, বিশ্বস্ত laboratory ও export client-ই হবে বাস্তব শিল্প।
সুযোগটি বাস্তব, ব্যর্থতার ঝুঁকিও বাস্তব। নীতি স্থিতিশীল থাকলে, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান দক্ষতা গড়ার এক ব্যবস্থায় কাজ করলে এবং প্রবাসী জ্ঞান জবাবদিহিমূলক বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত হলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর মূল্যশৃঙ্খলে জায়গা করতে পারে। প্রথম সাফল্য ‘Made in Bangladesh’ লেখা অত্যাধুনিক চিপ হবে না। প্রথম সাফল্য হবে এমন একটি বিশ্বস্ত জ্ঞানভিত্তিক খাত, যা রপ্তানি আয় করবে এবং ধীরে ধীরে আরও জটিল কাজ নিতে পারবে।
সম্পাদকীয় নোট: বাজারের পূর্বাভাস দ্রুত বদলে যায়। বৈশ্বিক বাজারের সংখ্যা WSTS-এর সর্বশেষ পাওয়া forecast; বাংলাদেশের তথ্য BIDA ও ভিন্ন বছর ও পরিধির শিল্পখাতের estimate থেকে নেওয়া। ২০৩০ সালের সংখ্যাটি একটি আকাঙ্ক্ষা—নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।
