NCP Diaspora Alliance GermanyNCP Diaspora Alliance Germanyমূল ওয়েবসাইট →

সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ

অঙ্ক ছুড়ে চরিত্রহনন নয়: আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটির অভিযোগে প্রমাণ কোথায়?

সম্পাদকীয় ডেস্ক · ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চার দেশের নাম, ১১ হাজার কোটি টাকার অঙ্ক এবং চাঞ্চল্যকর শিরোনাম আছে—কিন্তু প্রকাশ্য ব্যাংক নথি, সম্পদের দলিল বা লেনদেনের সূত্র কোথায়? পুরোনো অনলাইন দাবির সঙ্গে হুবহু মিল ও সময়রেখার অসঙ্গতি অভিযোগটির বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া

সংবাদ সম্মেলনে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ছবি: বাংলাদেশ সরকারের প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট (PID); Public Domain, Wikimedia Commons; ওয়েবের জন্য সম্পাদিত।

কাউকে দুর্নীতিবাজ প্রমাণ করতে বড় অঙ্ক উচ্চারণ করাই যথেষ্ট নয়। ১১ হাজার কোটি টাকা চার দেশে পাচারের অভিযোগ যদি সত্য হয়, তার পেছনে ব্যাংক হিসাব থাকবে, লেনদেনের রেকর্ড থাকবে, সম্পদের দলিল থাকবে, কোম্পানির উপকারভোগী মালিকানার সূত্র থাকবে। অথচ জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ নিয়ে রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমের ঝড় তোলা হয়েছে, সেখানে এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে এসেছে মূলত অঙ্ক ও অভিযোগ—money trail নয়।

দুর্নীতি দমন কমিশন অভিযোগ অনুসন্ধান করতে পারে এবং করা উচিত। কিন্তু অনুসন্ধান শুরুর ঘোষণাকে অপরাধ প্রমাণের সনদ বানানো যায় না। ১৪ সেপ্টেম্বর দুদক নিজেই বলেছে অভিযোগগুলো এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং অনুসন্ধানেই সত্যতা, সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা ও অর্থের উৎস-গন্তব্য নির্ধারিত হবে। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই আসিফ মাহমুদকে দোষী সাজানোর চেষ্টা ন্যায়বিচার নয়; এটি রাজনৈতিক চরিত্রহননের বিপজ্জনক সংস্কৃতি।

একই চার দেশ, একই চার অঙ্ক—২১৪ দিন আগের দাবির সঙ্গে হুবহু মিল

দুদকের সামনে আসা অভিযোগে দুবাইয়ে ৪,৫০০ কোটি, সিঙ্গাপুরে ৩,০০০ কোটি, অস্ট্রেলিয়ায় ২,০০০ কোটি এবং সুইজারল্যান্ডে ১,৫০০ কোটি টাকা পাচারের কথা বলা হয়েছে। বিস্ময়করভাবে এই একই চার দেশ ও একই চার অঙ্ক ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ বিডি টুডেজের একটি প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছিল—দুদকের ১৩ সেপ্টেম্বরের ঘোষণার ২১৪ দিন আগে। পুরোনো লেখাটিতে ‘গোয়েন্দা সূত্র’ ও ‘আন্তর্জাতিক ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স’-এর কথা বলা হলেও যাচাইযোগ্য নথি, হিসাব নম্বর বা দলিল দেখানো হয়নি।

এই মিলকে কাকতালীয় বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। আসিফ মাহমুদ যথার্থই জানতে চেয়েছেন—সাত মাস আগের অনলাইন দাবির বাইরে স্বাধীন আর্থিক উৎসটি কোথায়? দুদকের কাছে নতুন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ থাকলে সেটিই সামনে আসুক। কিন্তু পুরোনো, অনথিভুক্ত একটি বয়ানকে নতুন রাষ্ট্রীয় অনুসন্ধানের ভাষায় পুনরাবৃত্তি করা হলে সেই অনুসন্ধানের ভিত্তি নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।

Money trail ছাড়া ১১ হাজার কোটি কেবল একটি চাঞ্চল্যকর সংখ্যা

এত বড় অঙ্ক বিদেশে সরানো হলে অন্তত একটি অনুসরণযোগ্য চিহ্ন থাকার কথা—ব্যাংক ট্রান্সফার, SWIFT বার্তা, বিদেশি আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের যোগাযোগ, ভিলা বা জমির রেজিস্ট্রি, কোম্পানির শেয়ার রেকর্ড, nominee মালিকানার যোগসূত্র কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হিসাব। প্রকাশিত দুদক ব্রিফিং ও মূলধারার সংবাদে এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্দিষ্ট নথি নেই যা আসিফ মাহমুদকে ১১ হাজার কোটি টাকার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করে।

বরং অভিযোগে দুই শ্যালক ও এক ভাগনেকে অর্থপাচারের মাধ্যম হিসেবে দেখানোর জবাবে আসিফ বলেছেন, তাঁর শ্যালক একজন এবং যে ভাগনেকে টানা হয়েছে তার বয়স মাত্র আড়াই থেকে তিন বছর। একটি শিশুকেও চাঞ্চল্যকর অভিযোগের গল্পে ঢুকিয়ে দেওয়া প্রমাণের শক্তি বাড়ায় না; অভিযোগ তৈরির যত্ন ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আরও প্রশ্ন তোলে।

পদোন্নতির তারিখই অভিযোগের গল্প ভেঙে দেয়

যুব উন্নয়ন কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে অভিযোগের জবাবে আসিফ সরকারি আদেশ ও ট্রাইব্যুনালের নথি সামনে এনেছেন। আলোচিত পদোন্নতির আদেশ জারি হয় ১১ মে ২০২৬; অথচ তিনি উপদেষ্টার পদ ছাড়েন ১০ ডিসেম্বর ২০২৫। অর্থাৎ যে সিদ্ধান্তের জন্য তাঁকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, সেটি এসেছে তাঁর পদত্যাগের প্রায় পাঁচ মাস পরে এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ারও কয়েক মাস পর। এই সরল সময়রেখার উত্তর না দিয়ে কোটি টাকার অঙ্ক উচ্চারণ করা তদন্ত নয়—বিভ্রান্তি তৈরি।

আরেক অভিযোগে ৩৮ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিলের কথা বলা হলেও আসিফের দেখানো নথিতে সংখ্যা ১১২। তাঁরা ২০২১ সালে চলতি দায়িত্ব পেয়েছিলেন এবং প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালের রায় বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে সেই দায়িত্ব বাতিল হয়। অভিযোগে মানুষ, সংখ্যা ও সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটই যদি না মেলে, তাহলে সেই অভিযোগকে শিরোনামে সত্য বানানোর কোনো নৈতিক ভিত্তি নেই।

এলজিইডির ৫২ কোটি: অভিযুক্ত নিয়োগটি আসিফের দায়িত্ব নেওয়ার সাড়ে চার বছর আগে

এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানকে নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা নেওয়ার অভিযোগও সময়রেখার পরীক্ষায় টেকে না। প্রকাশ্য সংবাদ নথি বলছে, আব্দুর রশীদ খান প্রধান প্রকৌশলী হন ২০২০ সালের ২৫ এপ্রিল। আসিফ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান ১০ নভেম্বর ২০২৪। যে নিয়োগ তাঁর দায়িত্ব শুরুর প্রায় সাড়ে চার বছর আগেই সম্পন্ন হয়েছে, সেটিকে তাঁর ঘুষের ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা অভিযোগপত্রের মৌলিক তথ্যমানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

প্রকল্প বড় হয়েছে—তাই পুরো বৃদ্ধিই আত্মসাৎ, এই সমীকরণ অসৎ

উপজেলা পর্যায়ের মিনি-স্টেডিয়াম প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধিকেও সরাসরি ব্যক্তিগত আত্মসাৎ হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। অথচ সংশোধিত প্রকল্পে প্রায় ১৫০টির বদলে ২০১টি স্টেডিয়াম, ১২৩ উপজেলায় জমি অধিগ্রহণ, দুইতলা প্যাভিলিয়ন, দর্শক গ্যালারি, সীমানা প্রাচীর, অফিস-টয়লেট ও মাঠ উন্নয়নের মতো নতুন কাজ যুক্ত হয়েছে। ২০২২ সালের হালনাগাদ রেট শিডিউল, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য ও ডলারের বিনিময় হারও সংশোধনের কারণ হিসেবে নথিভুক্ত।

প্রকল্পে অনিয়ম থাকলে আইটেমভিত্তিক অতিমূল্যায়ন, ভুয়া দরপত্র, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার, কমিশনের লেনদেন বা অর্থ সরানোর নথি দেখাতে হবে। প্রকল্পের পরিধি ও সুবিধা বাড়িয়ে যে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে, সেই বৃদ্ধির পুরোটা একজন ব্যক্তির পকেটে গেছে—এমন সমীকরণ হিসাববিজ্ঞান নয়, রাজনৈতিক প্রচারণা।

আসিফের চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট; রাষ্ট্রের উত্তরও স্পষ্ট হতে হবে

১৪ সেপ্টেম্বরের ফেসবুক লাইভে আসিফ মাহমুদ বলেছেন, দেশের বাইরে তাঁর এক টাকার বিনিয়োগ, ব্যাংক আমানত, ভিলা, জমি—এমনকি একটি ধূলিকণার মালিকানাও প্রমাণ করা গেলে তিনি সেদিনই রাজনীতি ছেড়ে দেবেন এবং শাস্তি মেনে নেবেন। এটি আত্মপক্ষসমর্থনের অস্পষ্ট ভাষা নয়; রাষ্ট্র ও অভিযোগকারীর সামনে রাখা সরাসরি, যাচাইযোগ্য একটি চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রের বিদেশি সম্পদ অনুসন্ধানের সক্ষমতা আছে। কাজেই উত্তর কঠিন নয়: হিসাব থাকলে হিসাব দেখান, সম্পদ থাকলে দলিল দেখান, কোম্পানি থাকলে beneficial owner দেখান, লেনদেন থাকলে তার পথ দেখান। কিছুই দেখাতে না পারলে ১১ হাজার কোটির শিরোনাম প্রত্যাহার করে রাজনৈতিক চরিত্রহননের দায় স্বীকার করতে হবে।

দুদকের স্বাধীনতা কথায় নয়, পদ্ধতিতে প্রমাণিত হবে

দুদক বলেছে কাউকে লক্ষ্য করে কাজ করছে না। এই দাবি সত্য প্রমাণের একমাত্র উপায় হলো নিরপেক্ষ পদ্ধতি: অভিযোগ ও প্রমাণের সীমা স্পষ্ট রাখা, তদন্তের আগে ‘সত্যতা’ পাওয়ার ইঙ্গিত না দেওয়া, অভিযুক্তের জমা দেওয়া নথি সমান গুরুত্বে যাচাই করা এবং ফলাফল প্রকাশ করা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আগে দোষী বানিয়ে পরে বছরের পর বছর অনুসন্ধান চালানো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের আচরণ হতে পারে না।

শেষ কথা: প্রমাণ দিন, নইলে অপপ্রচার বন্ধ করুন

আসিফ মাহমুদ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারি থেকে উঠে এসে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন এবং এখন এনসিপির মুখপাত্র। তাঁকে প্রশ্ন করা যাবে, তাঁর সময়ের প্রতিটি সিদ্ধান্তও নিরীক্ষা করা যাবে। কিন্তু সেই নিরীক্ষা হবে নথি, হিসাব ও আইনের ভিত্তিতে—রাজনৈতিক সুবিধামতো বানানো অঙ্কের ভিত্তিতে নয়।

১১ হাজার কোটি টাকা সত্যিই পাচার হয়ে থাকলে money trail প্রকাশ করুন। আর যদি সেই trail না থাকে, তাহলে একজন তরুণ রাজনৈতিক নেতার সুনাম ধ্বংস করতে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে ব্যবহার করার এই চেষ্টা বন্ধ করুন। গণতন্ত্রে জবাবদিহি সবার জন্য; একইভাবে নির্দোষতার অনুমান, ন্যায্য প্রক্রিয়া এবং প্রমাণের মানও সবার জন্য। আসিফ মাহমুদের ক্ষেত্রে এর একটিও কম হতে পারে না।

তথ্যসূত্র

  1. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড: দুদকের বক্তব্য—অভিযোগ এখনও প্রতিষ্ঠিত নয়, অনুসন্ধানেই সত্যতা নির্ধারিত হবে
  2. দ্য ডেইলি স্টার: বিদেশে এক টাকাও পাওয়া গেলে রাজনীতি ছাড়ার চ্যালেঞ্জ ও অভিযোগের জবাব
  3. দ্য ডেইলি স্টার: পদোন্নতি ও চলতি দায়িত্বের নথি দেখিয়ে আসিফ মাহমুদের সংবাদ সম্মেলন
  4. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড: অভিযোগের তারিখ, পদোন্নতির আদেশ ও ট্রাইব্যুনাল-সংক্রান্ত বিস্তারিত
  5. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের ঘোষণা ও অভিযোগগুলোর সারাংশ
  6. বিডি টুডেজ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ প্রকাশিত একই চার দেশ ও একই অঙ্কের পুরোনো দাবি
  7. দ্য এশিয়ান এজ: মো. আব্দুর রশীদ খান ২০২০ সালে এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী নিযুক্ত হন
  8. দ্য ডেইলি স্টার: ১০ নভেম্বর ২০২৪-এ আসিফ মাহমুদকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়
  9. জাগো নিউজ: ২০১ স্টেডিয়াম, ১২৩ উপজেলায় জমি অধিগ্রহণ ও সংশোধিত প্রকল্পের পরিধি
  10. জাগো নিউজ: ১০ ডিসেম্বর ২০২৫-এ উপদেষ্টার পদ থেকে আসিফ মাহমুদের পদত্যাগ
  11. Wikimedia Commons: আসিফ মাহমুদের সংবাদ সম্মেলনের Public Domain আলোকচিত্র